যুগের সাথে ফতোয়ার পরিবর্তন কি নিন্দনীয়?

আল-ইয ইবনু আব্দিস সালাম, আল-কারাফি, ইবনুল কায়্যিম ও অন্য অনেকেই স্পষ্টত উল্লেখ করেছেন যে- প্রথা, রীতিনীতি, সময় বা হুকুমের উপর প্রভাব বিস্তারকারী অন্য যে কোনো প্রভাবকের পরিবর্তনের ফলে, একই হুকুম বা মাসয়ালা পরবর্তীতে পরিবর্তিত হতে পারে।

‘সময়, স্থান, অবস্থা ও উদ্দেশ্যের পরিবর্তনের ভিত্তিতে ফতোয়ার পরিবর্তন ও ভিন্নতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে ইবনুল কায়্যিম বলেন: “এটি অত্যন্ত উপকারী একটি অধ্যায়। এ বিষয়ে অজ্ঞতার কারণে শারিয়ার উপর মারাত্মক সব ভুল আরোপ করা হয়েছে এবং ফলস্বরূপ অবর্ণনীয় কষ্ট, ক্লেশ ও বোঝা চাপানো হয়েছে। অথচ মাসলাহা ও কল্যাণের সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত যে মহান শারিয়া আমরা চিনি, তা কখনোই এরকম কিছু নিয়ে আসতে পারে না”।

পরবর্তী যুগের অনেকেই আবার এই মূলনীতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশস্ততা অবলম্বন করেছেন। তারা শুধুমাত্র প্রথা ও রীতির উপর নির্ভরশীল হুকুমগুলোর ক্ষেত্রে তা সীমাবদ্ধ রাখেননি।

অন্যদিকে কিছু আলিম মূলনীতি মানতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ তাদের বুঝ অনুযায়ী, এই নীতিকে তারা সব ধরনের হুকুমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করেছেন। অথবা তারা বাহ্যত এই নীতি থেকে এমন সম্ভাবনা সৃষ্টির আশঙ্কা করেছেন, যা থেকে মনে হতে পারে যে, একই মাসয়ালার হুকুম হয়ত নাসখ ব্যতীতই স্বয়ং মহামহিম আল্লাহর নিকটও পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

পূর্বোক্ত আলিমগণ যুগ ও অবস্থার পরিবর্তনের সাথে হুকুমের পরিবর্তন হিসেবে যেসব উদাহরণ পেশ করেছেন, সেসবের ব্যাপারে তারা বলেন যে, এসব ক্ষেত্রে শারঈ হুকুমের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং পূর্বের দৃশ্যপটে এমন কোনো কার্যকারণ উপস্থিত ছিল, যা পরবর্তী দৃশ্যপটে ছিল না। ফলে এক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাহ্যিক দৃশ্যপটের সাথে হুকুমের সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটেছে।

এর একটি উদাহরণ হতে পারে, স্ত্রীর ভরণপোষণের বিধান। পূর্বে তা নির্ধারিত হতো খুব সামান্য পরিমাণ খাবারদাবার ও পোশাক দ্বারা, যেহেতু মানুষ সেভাবেই এর সাথে পরিচিত ছিল। কিন্তু এই যুগে ঠিক একই পরিমাণ খাবার ও পোশাক যথেষ্ট হিসেবে গণ্য হবে না। একই কথা বাসস্থানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। স্বামীর উপর স্ত্রীর জন্য ঠিক কী ধরনের বাসস্থানের বন্দোবস্ত করে দেয়া ওয়াজিব, শারিয়া তা সুনির্দিষ্ট করে দেয়নি। বরং তা প্রচলিত রীতিনীতি, স্বামীর সক্ষমতা, আর্থিক স্বচ্ছলতা ইত্যাদির উপর ছেড়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে হুকুমের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং তা সাধারণ একটি নীতি রূপে এসেছে, বিবাদের ক্ষেত্রে যার ব্যবহারিক প্রয়োগের ভার ন্যস্ত করা হয়েছে বিচারকের উপর। আর এর পরিমাণ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির লোকালয় ও তাদের প্রথার উপর নির্ভর করা হবে।

একারণেই কোনো এক যুগে বা লোকালয়ে হয়ত একটি কক্ষই শারিয়া নির্ধারিত বাসস্থান হিসেবে বিবেচিত হতো। আবার অন্য কোনো স্থানে হয়ত চার কক্ষবিশিষ্ট ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা সম্বলিত না হলে তা যথেষ্ট বলে গণ্য হবে না।

একইভাবে কোনো মন্দকাজের নিন্দাজ্ঞাপন করা তখনই ওয়াজিব হবে, যখন নিন্দাকারীর ধারণা প্রবল হয় যে, এর নিন্দা করা হলে সে মন্দের অপনোদন ঘটবে। কিন্তু যদি তার ধারণা প্রবল হয় যে, এর নিন্দা জ্ঞাপন করা হলে তা আরো নিকৃষ্ট মন্দের দিকে ধাবিত করবে, সেক্ষেত্রে নিন্দা করাটাই হারাম।

এরপরও হুকুম পরিবর্তিত হয়েছে এমনটা বলা উচিত নয়। বরং আরো নমনীয় কোনো ভাষ্য বাছাই করা উত্তম।

তাই এই মূলনীতিটি ভালভাবে আত্মস্থ করাটা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে এর মাধ্যমে সুস্পষ্ট কোনো বিধানকে কেউ রহিত না করে দেয়, যেসব ক্ষেত্রে প্রথা, প্রচলন প্রবেশের কোনো সুযোগই নেই।

কাওয়ায়িদ ফিকহিয়্যার বইগুলোতে লেখকগণ যেভাবে এই মূলনীতিটি উল্লেখ করে থাকেন, সেখানে শুধুমাত্র যুগ ও অব

স্থার পরিবর্তনের সাথে যার ফতোয়া পরিবর্তিত হয়েছে, তার নিন্দা করা থেকে বিরত থাকার কথা আছে।

বিচারিক হুকুমও ফতোয়ার মতই। একারণেই আলিমগণ একমত যে, কোনো স্থানে বিচারক তার রায় দেয়ার পূর্বে সংশ্লিষ্ট লোকালয়ের অভ্যাস ও প্রথা সম্পর্কে জানা তার জন্য ওয়াজিব। আর যার এব্যাপারে কোনো জ্ঞান নেই, তার জন্য রায় প্রদান করা জায়িয নয়।

[উৎস: উসুলুল ফিকহ আল্লাযি লা ইয়াসাউল ফাকিহু জাহলাহু; ড. ইয়াদ্ব আস-সুলামি]

অনুবাদ- ইমরান হেলাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *