বিয়ে, তাকদির ও পরীক্ষার আখ্যান- যুগের দারাকুতনি আহমাদ মা’বাদের জবানে…

[শায়খ ড. আহমাদ মা’বাদ আব্দুল কারিম। মিশরের শায়খুল হাদিস এবং বর্তমান জমানার অন্যতম প্রখ্যাত মুহাদ্দিস। একটি ভিডিওতে তিনি বিয়ে এবং বিবাহিত জীবন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, তাকদির এবং পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করেছেন। উস্তাদ আহমাদুল্লাহ আল-জামির কলমে সেটারই ভাবানুবাদ এই লেখাটি। লেখাটি উস্তাদের অনুমতি সাপেক্ষে ব্লগে পোস্ট করা হয়েছে।- ফিকির ব্লগ সম্পাদক]


এক.

বিবাহিত জীবনে আমাদের নানাবিধ পরীক্ষা আসে। একজন পড়ুয়া যুবক যখন বিয়ের চিন্তা করে, তখন তাঁর জন্য সর্বপ্রথম পরীক্ষা হয় রিযিকের। দ্বিতীয় পরীক্ষা হয় একজন ধৈর্যশীলা ও সহযোগী জীবনসঙ্গীনী প্রাপ্তির। আমরা অনেকেই এখানটায় হেরে যাই। একটা মিললে হয়তো আরেকটা মিলে না। তখন নানাবিধ সংকট আমাদের ঝাপটে ধরে, হতাশায় আমার শ্বাস ভারি হয়। কিন্তু এই দুই পরীক্ষার বাইরে যাওয়া আমাদের জন্য স্বপ্নের জগত। এজন্য বিয়ের আগে সর্বপ্রথম কাজ তো দুআ দুআ এবং দুআ। দ্বিতীয়ত নিজেকে ‘সাবের’ হিসেবে তৈরি করা। এই দুইয়ের মিশেল যদি না হয়, তাহলে সারাজীবন তড়পানো ছাড়া আর কিছু করার নেই। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

আচ্ছা শায়েখের কথা বলি। তিনি জানাচ্ছেন – ‘আমার ডক্টরেট থিসিসের কাজ চলাকালীন আমার পরিবার আমার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তখন পড়াশোনা ছাড়া যা করি, তা হলো– রাষ্ট্রীয় সামান্য বেতনে একটা মসজিদে ইমামতি! কিন্তু আমার মায়ের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন, তিনি আমাকে বিয়ে করাবেন। যেন আমার বাচ্চাদের তথা তাঁর নাতি নাতনিদের দেখে যেতে পারেন। ফলত পারিবারিকভাবে বিয়ের তোড়জোড় শুরু হলো। ভীতি ও আশঙ্কা রেখেই আমি সায় দিলাম। কিন্তু বিবাহিত জীবন নিয়ে আমি সবসময় মসজিদের মিহরাবে দুআ করতাম যে, “আল্লাহ! আমার জীবনে বিরক্তিকর কোনো নারী যেন না আসে। এবং কোনো চাকুরিজীবী নারীও যেন না আসে”।

দ্বিতীয় দুআটা আমি আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে করতাম। কারণ, আমার জীবনের যত বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা বৈবাহিক ফাসাদ দেখেছি, তা ঘরের রমণী চাকুরিজীবী হওয়ার কারণেই দেখেছি। তো যাই হোক, আমার প্রথম দুআটা কবুল হয়েছিল। দ্বিতীয়টা হয়নি! কারণ, আমার পরিবার আমার জন্য ঠিক করলেন জার্মানিতে পড়ুয়া মেডিকেলে চাকুরিজীবী এক রমণীকে। আমার মায়ের পছন্দ ছিল বলেই বাধ্য হয়ে চাকুরিজীবী মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হলাম। ইতস্তত বোধ নিয়েই আমি তাঁর সাথে খোলামেলা কথা বললাম। পরবর্তীতে উভয়ে এবং উভয়ের পরিবার এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে, আমার ডক্টরেট থিসিসের পর ইনকামের সোর্স হলে চাইলে তিনি চাকুরী ছেড়ে দিবেন। পারিবারিক সাক্ষীর উপস্থিতিতে এ মর্মে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম কেউ কাউকে না দেখেই। তিনি গ্রামে আমি কায়রোতে। শুরু হলো আমাদের প্রেমময় সংগ্রামের এক জীবন। আমার আহলিয়া মেডিকেল সাইন্সের একটা বিরল বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। যার গবেষণা তখনও শেষ হয়নি। এর জন্য জার্মানিতে পড়ার পাশাপাশি তাঁকে শিখতে হয়েছে ইংরেজি, ফ্র্যান্সিস ও ইতালিয়ান ভাষা। ফলে তিনি পুরোদস্তুর পড়ুয়া ও কর্মঠ নারী। পড়ছেন, চাকরি করছেন আবার ঘর সামলাচ্ছেন।ইতোমধ্যে লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলো! এবং হতাহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ডাক্তার নেয়া হচ্ছিল। ঘটনাক্রমে আমার স্ত্রীকেও তারা নিতে চাইলো। কিন্তু ঝামেলা হলো আমাকে নিয়ে! তিনি ছাড়া আমি থাকবো না। আমাকে ছাড়াও তিনি যাবেন না। এদিকে আমাদের বৈবাহিক চুক্তিতেও ছিল যে, আমি আমার থিসিসের কাজে ব্যস্ত থাকবো। বিদেশ সফরের কোন কথা ছিল না। কিন্তু তাঁর আবেদনে লিবিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আখেরে আমাদের দু’জনকেই যাওয়ার ব্যবস্থা করলো এবং কোন কাজ ছাড়াই কিছু সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে আমার দায়িত্ব নিতেও তাঁরা রাজি হলো। ফলে বৈধ পন্থায় আপাতত এক বছরের জন্য লিবিয়ায় যেতে আমরা চুক্তিবদ্ধ হলাম।

দুই.

শুরু হলো আরেক জীবন। বিদেশে আমাদের ছোট্ট ও সুখের সংসার। কিছুটা ভীতি ও অনেকটা নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে লিবিয়ায় আমরা পৌঁছেছিলাম ঠিকই। কিন্তু আল্লাহর পরীক্ষা ও কুদরতের কারিশমা শুরু হলো, লিবিয়ায় অবতরণের দুই ঘন্টা পরেই! লিবিয়ার শাসক ‘কাযযাফি’ ঘোষণা দিলেন, “এখন থেকে কোন বিদেশী লিবিয়ায় পূর্ণ এক বছরের বৈধ কোন কাগজপত্র পাবে না”! আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো যেন। কুদরতের কারিশমায় ঠিক তখনই প্রিয় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক থিওলজি ফ্যাকাল্টি থেকে সার্কুলার আসলো সহকারী শিক্ষক নিয়োগের। একদিকে লিবিয়ায় অবস্থানের অনিশ্চয়তা আর অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত খেদমতের হাতছানি। আমি আল আজহারকে বেছে নিলাম। তবে, লিবিয়ায় আমার স্ত্রীর কর্মক্ষেত্র যে হসপিটালে। তারা কাযযাফির ঐ ঘোষণার পরও আমাদের আশ্বস্ত করতে চাইলো যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে কাগজপত্র না মিললেও আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আপনাদের রাখবো। আমার স্ত্রীকে বললো, এক বছর পরেও যদি আপনি আমাদের এখানে কাজ কন্টিনিউ করতে চান, আমরা সে সুযোগ অবারিত রাখবো। আমি আমার আহলিয়াকে বললাম, আমি আল আজহারে আবেদন করতে চাই। চাকরি হয়ে গেলে তোমার কাগজপত্র পাঠিয়ে দিব, তুমি চলে আসবে। কিন্তু এদিকে চির আকাঙ্ক্ষিত আরেক বিষয় হাজির হলো আমার জীবনে। আমাদের দুজনের সংসার আলোকিত করে আমার মেয়ে জন্ম নিল। সেই অপরিচিত শহরেও আমাদের কী সুখ তখন! আমাদের চোখের তারা আমাদের কোল ভরিয়ে দিয়েছে। বিদেশের নানাবিধ সংকট, অনিশ্চয়তা সবকিছু তখন আমাদের কাছে নস্যি। আমাদের বেঁচে থাকার কেন্দ্রবিন্দু ও একমাত্র অবলম্বন হয়ে গেছে তখন আমাদের মেয়ে, আমার চোখতারা।

সুখময় এই সময়েই আল আজহারের দুটি ক্যাম্পাস থেকে আমার নিয়োগপ্রাপ্তির খবর আসলো। একটা কায়রোতে আমার পাঠকালের আজহারের প্রাচীন ক্যাম্পাস, আরেকটা মিশরের আসইউত জেলায়। রবের করম! তখন সেই মুহূর্তে আমি না পারছি আজীবন কাঙ্ক্ষিত কা’বাতুল ইলমের প্রাঙ্গনে ছুটে আসতে, না পারছি আমার নয়নতারা স্ত্রী ও কন্যাকে ছেড়ে আসতে! কী এক মধুর যন্ত্রণা আমার। আমি ধৈর্য ধরলাম। কিছুদিন অপেক্ষা করে লিবিয়ার জীবন চুকিয়ে সবাইকে নিয়ে ফিরে আসলাম প্রাণের মিশরে, আল আজহারের প্রাঙ্গনে। এসেই আল আজহারে শিক্ষকতার পাশাপাশি আমার থিসিস ডিসকাশন সম্পন্ন করলাম। এদিকে বছরকয়েক না যেতেই আরেক সংকট এসে হাজির! মিশর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে যে, বাধ্যতামূলকভাবে আমার স্ত্রীকে তাঁর বিরল গবেষণা সম্পন্ন করতে হবে সৌদির রিয়াদে। অন্যথায় মিশর সরকারের ব্যবস্থাপনায় জার্মানিতে তিনি যে চার বছর পড়েছেন, এখন তার সম্পূর্ণ খরচ আদায় করতে হবে! আমার জন্য যা বড় একটা পরীক্ষা ছিল। একটা নতুন সংসার, নতুন সন্তানের অভিভাবক হয়ে আমাকে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে সৌদির রিয়াদে পাঠাতে রাজি হতে হলো! কারণ, অর্থনৈতিক চাপ। এত টাকা আদায়ের সম্ভাব্য কোন সুযোগ আমার ছিল না! ক্ষুদ্র আয়ের মানুষ আমি। বাধ্য হয়েই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, মেয়েকে নিয়ে আমি থেকে যাব, আমার স্ত্রী সৌদিতে থাকবেন এক বছরের জন্য। কিন্তু আল্লাহর কুদরত এখানেও আমার সহায় হলো। আমার এক বন্ধুজন বললেন, আপনি যদি ‘আল ইমাম ইউনিভার্সিটি’র উস্তাদ হতে চান, তাহলে আমি দ্রুতই ব্যবস্থা করব। এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব এড়ানোর সুযোগ ছিল না আমার। সবকিছু সম্পন্ন হলে আমি এক বছরের জন্য আজহার থেকে ছুটি নিয়ে সৌদি পাড়ি জমালাম।

তিন.

শুরু হলো নবিজির দেশে আমার পথযাত্রা। ১৯৭৮ এ আল ইমাম ইউনিভার্সিটিতে সূচনা হলো আমার শিক্ষকতার দ্বিতীয় পিরিয়ড। রিয়াদে যাওয়ার পর দেখা গেলো, আল ইমামে ডক্টরেট করা কোন উস্তাদ নেই! সেখানে সর্বপ্রথম ডক্টরেট করে আমার ছাত্র কা’বার ইমাম আবদুর রহমান আস সুদাইস। ফলে ৬ মাস যেতে না যেতেই ভার্সিটি কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রস্তাব করলো সিনিয়র অধ্যাপক পদ গ্রহণের। আমি চিন্তা করার জন্য সময় চাইলাম। কারণ, আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান আল আজহার ছাড়তে মন চাইছিলো না। তাই বছর শেষ হলে আমি পরিবার নিয়ে আজহারের প্রাঙ্গনেই ফিরে আসলাম। কিন্তু এদিকে ঘটে গেলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা! আল ইমামে আমার মিশরী কিছু ছাত্র ও পরিচিতজন দেশে ফিরে প্রচার করেছে যে, আমি ওখানে স্যাটেল হয়ে গেছি! আজহারে আর ফেরত আসবো না! অথচ, আমি সবাইকে নিয়ে ঠিকই ফিরে এসেছি। এই তথ্য পেয়ে আজহার কর্তৃপক্ষ আমার পূর্ব নিয়োগ বাতিল করে দিয়েছিল! আমি ফিরে এসে যতই তদবির করলাম নতুন ডীন ও ভিসি আমার নিয়োগ পুনর্বহাল করতে কোনোভাবেই আর রাজি হলেন না!

তখন আল্লাহ আমাকে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন। জীবনের এই মুহূর্ত হয়তো কখনোই ভোলা যাবে না। আল ইমামে ফিরে যাওয়ার অপশন তখনও ছিলো। কিন্তু আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাসায় পড়ে থাকলাম। আমার মাথায় রাজ্যের পেরেশানি চেপে বসলো যেন। আমি কিছু না ভেবে ধৈর্য ধরে পড়ে থাকলাম। ইতোমধ্যে আল ইমাম ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ সবকিছু জানতে পেরে স্বয়ং ভিসি এসে হাজির হলেন আমার বাসায়। আমাকে সৌদির রিয়াদে ফিরে যেতে আবেদন করলেন। উপায়ান্তর না দেখে আমি রাজি হলাম। শুরু হলো আল ইমাম ইউনিভার্সিটিতে আমার শিক্ষকতার তৃতীয় পিরিয়ড। এরপর পরিবারসহ একটানা ১৮ বছর সৌদির রিয়াদে কাটিয়ে আবার ফিরলাম প্রাণের আজহারে।


শিক্ষণীয়: তাকদিরের উপর খুশি থাকা। খুব বেশি দুআর ইহতিমাম করা। জীবনের চড়াই উৎরাই দেখে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরা। শায়েখের জীবনের এই গল্পে বিবাহিত অবিবাহিত সবার জন্য বড় আরেকটা শিক্ষা হলো, স্ত্রীর স্বপ্নকে বড় করে দেখা। তাঁর স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার গুরুত্ব দেয়া। তাঁকে সাহস জোগানো, উৎসাহ দেয়া।

২৩ || ৪ || ২০২৩

(উল্লেখ্য, শায়েখের বক্তব্যের আক্ষরিক অনুবাদ করা হয়নি। নিজের মতো করে লেখেছি আমি)

অনুলিখনঃ উস্তাদ আহমাদুল্লাহ আল-জামি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *