সন্তানের হক

মূল- মুফতি ইবনে আদম আল-কাওসারি (হাফিযাহুল্লাহ)

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম 

শিশুরা আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতা-মাতার প্রতি রহমত ও নেয়ামত স্বরুপ। তারা চক্ষুশীতলকারী। শুধু তাদের জিজ্ঞেস করেই দেখুন, যাদের আল্লাহ এই নেয়ামত লাভের সৌভাগ্য দেননি! শরীয়তও শিশুদের নির্দিষ্ট কিছু হক বা অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে যা পিতামাতার পালন করা আবশ্যক। 

এবার, সংক্ষিপ্ত করে শিশুদের মৌলিক অধিকারগুলো দেখা যাক- 

এক) শিশুদের প্রতি পিতামাতার সর্বপ্রথম দায়িত্ব হল তাদের সন্তানদের ইসলামি মূল্যবোধে বড় করা। পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের জন্য দায়ী। 

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর…” (সূরা আল-তাহরীমঃ ০৬)

উপরের আয়াত থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, নিজের পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাচানোর ফিকির না করে কেবলমাত্র একা একা শরীয়ত মেনে চললেই  আখিরাতে নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে না। নিজেকে আখেরাতের শাস্তি থেকে হেফাজতের জন্য অবশ্যই শিশুদের সঠিক ইসলামি মূল্যবোধে বড় করা নিশ্চিত করতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায় যে পিতা দ্বীনি বিভিন্ন কাজে খুবই সক্রিয়, কিন্তু তার সন্তানদের দ্বীনের প্রাথমিক বিষয়গুলোও জানা নেই। সে একদম সময় মেনে সালাত, রোযা, যাকাত এবং দ্বীনের অন্যান্য অংশ পালন করে, সেখানে তার ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন খারাপ কাজ ও পাপাচারে ডুবে আছে। তবুও সেই পিতা নিজের আমল নিয়ে সন্তুষ্ট।

আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে- যদি নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে চান, তাহলে পরিবারকে অবশ্যই ভালো এবং খারাপ কাজের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। 

অনেক সময় মানুষ বলে- ‘আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু সন্তান আমাদের কথা শুনতে চায় না। তাই আমাদের দোষ নাই।’ এটা সত্য, যদি পিতা-মাতা সন্তানদের সঠিক ইসলামি মূল্যবোধ দিয়ে বড় করার দায়িত্ব পূরণ [পর্যাপ্ত চেষ্টা] করে থাকে, কিন্তু সন্তানেরা তাও কখনো আমলে নেয়নি, তাহলে তাদের উপর থেকে দায়ভার থাকবে না। কিন্তু কুর’আনের আয়াতে ‘আগুন’ শব্দ দিয়ে বোঝানো হয়েছে- তোমরা অবশ্যই সন্তানদের আখেরাতের আযাব থেকে এমনভাবে বাঁচাতে চেষ্টা করবে, ঠিক যেভাবে তাদেরকে দুনিয়াতে আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে। যদি আমরা তা করতে অক্ষম হই, তাহলে আমাদের কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে।

দুই) সন্তানের দ্বীনি শিক্ষার পিতা-মাতারা  জন্য দায়বদ্ধ। সন্তানদেরকে অবশ্যই দ্বীনের প্রাথমিক জ্ঞান গুলো শিক্ষা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আকিদা, তাওহিদ ও আল্লাহর সিফাত [আল্লাহ একত্ব ও গুণাবলি], নবিজীর (সঃ) সিরাত, হালাল-হারামের মৌলিক ধারণা, নামাজ রোজাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ফিকহি মাস’আলা।

তিন) সন্তানদের প্রতি পিতামাতার আরেকটি দায়িত্ব হলো নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, যাতে সে নীতি-নৈতিকতাকে বাস্তবিক জীবনে প্রয়োগ করতে পারে। শিশুদের শিক্ষা দিতে হবে–  মিথ্যা বলা, ধোঁকা দেওয়া, গীবত করা, ঝগড়া করা, লড়াই করা, চুরি করা, গালি দেওয়াসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ একেবারে গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি পিতামাতার নিজেদের থেকেও সুন্দর দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। 

চার) সন্তানদের শা্রীরিক প্রশিক্ষণের নজর রাখাও পিতামাতার গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। এর ফলে সন্তানরা সতর্ক এবং সুস্থ থাকে। তাদেরকে শরীরের জন্যে উপকারী ব্যায়াম ও শরীরচর্চার জন্য উদ্বুদ্ধ করা উচিৎ। 

পাঁচ) সন্তানরা যাতে ভালো ও দ্বীনদার বন্ধু-বান্ধব নির্বাচন করে এবং অসৎসঙ্গ থেকে দূরে থাকে- তা পিতামাতাকে নিশ্চিত করতে হবে।  

ছয়) সন্তানদেরকে অবশ্যই সকল উপায়ে স্নেহ ও ভালোবাসা দেখাতে হবে। পিতা-মাতাদের উচিৎ তাদের সন্তানদেরকে বেশি সময় দেওয়া এবং কোনোভাবে অবহেলিত অনুভব করতে না দেওয়া। 

সাত) পরিশেষে, পিতারা সন্তানদের আর্থিক সহায়তার জন্য দায়বদ্ধ। কিন্তু এখানে কিছু পরিস্থিতি রয়েছে-

ক) যদি ছেলে বা মেয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে বা উপহারের মাধ্যমে ধনী হয়ে যায়, তাহলে পিতার জন্য তাদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করা ওয়াজিব নয়। বরং তাদের খরচ তাদের নিজেদের সম্পদ থেকেই নেওয়া হবে।

ইমাম আল-হাসকাফি (রহঃ) বলেনঃ-

“ যদি সন্তান গরীব আর নাবালেগ হয়, পিতার জন্য তাদের ভরণপোষণ বহন করা অপরিহার্য।“ (দূররুল মুখতার)

খ) যদি তাদের ধন-সম্পদ না থাকে এবং বালেগ হয়, তাহলে দুটো সম্ভাবনা রয়েছেঃ-

প্রথমত, যদি তাঁরা কাজ করতে এবং নিজেদের খরচ বহন করতে সক্ষম হয়, তাহলে পিতার উপর দায়বদ্ধতা থাকবে না। 

ইমাম ইবনে আবেদিন (রহঃ) বলেনঃ-

“ যদি তারা কাজ করতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের পিতার উপর দায়িত্ব হল তাদের জন্য কাজ খুজে দেওয়া এবং তাদের আয় থেকে তাদের খরচ হবে….। এই বিষয়টি মেয়েদের জন্যেও প্রযোজ্য, সেও মানানসই কাজ খুঁজবে যেমন- সেলাই করা বা তাঁত বোনা।” (রদ্দুল-মুহতার, ৩/৬১২)

দ্বিতীয়ত, যদি তাঁরা কাজ করতে সক্ষম না হয়, তাহলে পিতার তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে দায়বদ্ধ থাকবে। ইমাম হাসকাফি বলেছেন,

“একইভাবে, আয় করতে অক্ষম এমন প্রাপ্তবয়স্কদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া অপরিহার্য।“ (দূররুল-মুখতার)

গ) যদি সন্তান বালেগও না হয়, তাঁর সম্পদও না থাকে- তাহলে পিতা বেঁচে থাকলে  পিতাকেই খরচ বহন করতে হবে। আর পিতা মারা গেলে তার মাতা এবং  পরিবারের অন্যান্য আশু বা নিকটস্থ সদস্যদের উপর এই দায়িত্ব পড়বে।

এখানে আরেকটা বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিৎ যা ফুকাহায়ে কেরাম উল্লেখ করেছেন,  আয় না করার পক্ষে দ্বীনি ইলম অর্জন করা ভালো একটি ওজর। এমন পরিস্থিতিতে পিতার উপর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। তবে ইবনে আবেদিন বলেছেন এই পরিস্থিত হলো তখন যখন ছাত্ররা নিজেদের পড়ালেখার বিষয়ে খুবই সিরিয়াস ও মনযোগী । কিন্তু বর্তমান সময়ে তাদের বেশিরভাগই সময় এবং টাকাও নষ্ট করে। তারপরও সন্তান যদি বুদ্ধিদীপ্ত এবং পড়ালেখায় সিরিয়াস হয়, তাহলে পিতার উপরে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব বর্তাবে। 

তবে এগুলো দ্বীনের প্রাথমিক ও মৌলিক জ্ঞানের জন্য। ফুকাহাগণ উল্লেখ করেছেন, এগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে জরুরি (ফরযে আইন), তাই পিতা-মাতারা তাদের বাঁধা দিতে পারবে না। তবে এর বাইরে পড়ালেখা করতে চাইলে পিতা-মাতার অনুমতি সর্বপ্রথম প্রয়োজন।

এবং আল্লাহই ভাল জানেন।


অনুবাদ- নাহিয়ান চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *