আল্লাহর পথে দাওয়াত ও সংগ্রাম

-মূল লেখক: শাইখ হাবিব আল-জিফরি 

রাজা-শাসকদের সান্নিধ্যে যারা বসে, তাদের সম্মান-তাযিম করা মানব প্রকৃতির অংশ। দুনিয়ার আরেকটি প্রকৃতি, বরং তাবৎ অস্তিত্বেরই প্রকৃতি হলো সৃষ্টিকর্তার গভীর সান্নিধ্যে থাকা মানুষদের সম্মান-তাযিম করা— সেটার উপলদ্ধি আসুক বা না আসুক। এখানে “তাযিম” এর মর্ম হলো— তাদের হতে এবং তাদের মাধ্যমে  ফায়দা নেওয়া। উম্মাহর আসন্ন বিষয়াদির প্রস্তুতির জন্যে দুনিয়ার সাথে আমাদের এমন সম্পর্ক-সংযোগ স্থাপন করা আবশ্যক। 

আমাদের অস্তিত্বের নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রয়েছে। অযথা আমাদের সৃষ্টি করা হয়নি। ইসলামের রহমত যেমন আমরা বিনা কারণে পাইনি, তেমনি বিখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্য আমরা এমনিই পেয়ে যাইনি। এই আলোকিত ভূমিতেও (ইয়েমেনের তারিম) তুমি বিনাকারণে আসো নি, যেখানে রাসুলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরাধিকারের বিশেষ খাজানা রয়েছে। এই উম্মাহর সেবায় আজ তুমি নবীজীর (সা) সাথে অবিচ্ছিন্ন সনদে যুক্ত— এটাও কোনো কারণ ব্যতীত হয়নি। বরং আল্লাহ্‌ই তোমাকে এসব দিয়েছেন এবং তোমার জন্যে এসব প্রস্তুত করেছেন, যাতে এই দুনিয়ায় তোমার উপর যে দায়িত্ব আসছে, তার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারো। 

আর যখনই ধাবমান লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ব্যাপারে মানুষ শুনে, তার আক্কল কেবল আশেপাশে ঘটা বাহ্যিক বিষয়ে বিক্ষিপ্ত চিন্তায় মগ্ন হয়ে যায়। কিন্তু কেবল এটুকু নিয়েই ব্যস্ত থাকা উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের আশেপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয় (যেগুলো আমাদের খুশি করে, যেগুলো দুঃখ-কষ্ট দেয়, যেগুলো পীড়াদায়ক এবং কঠিন) তোমার অন্তরে যেন প্রভাব না ফেলে, এগুলো যেন বড় কোনো বিষয় না হয়ে ওঠে। আল্লাহ্‌ যাদেরকে এই দুনিয়ার ইসলাহ এবং সংশোধনের জন্যে বাছাই করেছেন, তাদের উচিৎ নয় দুনিয়া ও দুনিয়ার ঘটে যাওয়া বিষয়কে কোনো মূল্যবান ও গুরুত্বের বস্তু মনে করা। বরং তাঁরা তো তাদের সম্মান ও গুরুত্বের কেন্দ্র হবে আল্লাহ আল-আ’লিমআল-আলিম“আল- আলি’’ “আল-আজিজ”।  

উম্মাহর দুর্দশায় আমরা কষ্ট পাই। আমরা আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা করি, চোখের পানি ফেলি, তাঁর নিকট ফিরি, তাওবা করি, ক্ষমা প্রার্থনা করি যাতে আমরা নিজেরাই উম্মাহর এই কষ্টের জন্যে দায়ী হয়ে না উঠি। এই উম্মাহর সংশোধনের জন্যে আমাদের দু’আতে আল্লাহ্‌র নিকট ফরিয়াদ জানাই। একই সাথে, এই সংশোধনের জন্যে তিনি আমাদের যে মাধ্যমগুলো দিয়েছেন, সেগুলো ব্যবহারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি। এই ব্যাপারটা মাথায় রেখে কখনোই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের শেকড় এবং প্রাণ থেকে দূরে সরে যাওয়া যাবে না।

তোমার সবসময় মাথায় রাখতে হবে, তোমার সৃষ্টির একটি মৌলিক কারণ রয়েছে। “আর আমরা মানুষ এবং জিনজাতিকে আমার ইবাদাত ব্যতিরেকে অন্য কারণে সৃষ্টি করিনি।” (সূরা যারিয়াত, আয়াত ৫৬) আল্লাহ্‌ আমাদের কেবল তাঁর ইবাদাতের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। আরবি ভাষায় কোনোকিছু সাব্যস্ত এবং নির্দিষ্ট করার অন্যতম শক্তিশালী পদ্ধতি হলো নাফি বা বাতিলকরণের (আমরা সৃষ্টি করিনি) পর খাস বা বিশেষ বিষয় (শুধু এ কারণ ছাড়া যে তাঁরা আমার ইবাদাত করবে) আসা। তাই আল্লাহ্‌, আল-আলি, আল-আজিজ সাব্যস্ত করেছেন— আমাদের সৃষ্টির একমাত্র কারণ তাঁর ইবাদাত করা। এজন্যে এই মাকসাদের চেয়ে আমাদের জীবনে আর কোনো বড় মাকসাদ থাকা উচিৎ নয়। এটাই ভিত্তি। 

আর এই ভিত্তি থেকেই আল্লাহর মাখলুকের সাথে আমাদের করণীয় ও দায়িত্ব নির্ধারিত হয় । হে রব, তুমি আমাদের শুধুমাত্র তোমারই ইবাদাতের জন্যে সৃষ্টি করেছ। কিন্তু তুমি আমাদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা স্থানে ইবাদাতের জন্যে সৃষ্টি করনি। আমাদের আশেপাশে তোমার মাখলুককে রেখেছ। হে আমাদের রব, এর কারণ কি? আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া-তায়ালা বলেছেন, 

“আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা নিযুক্ত করছি।” 

তাই এই দুনিয়াতে আমাদের লক্ষ্য হলো আল্লাহ্‌ আযযা-ওয়াজ্জাল যা চান, তা প্রতিষ্ঠা করা। আর এর মধ্যে রয়েছে ইলম অন্বেষণ করা, আল্লাহ্‌র দিকে আহবান করা, এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা। 

দয়া করে মনে রাখবে, জিহাদের অনুবাদ যুদ্ধ নয়, কারণ যুদ্ধ জিহাদের একটি প্রকাশ মাত্র। জিহাদ শব্দটি এসেছে “আল-যাহদ” থেকে (যার অর্থ সংগ্রাম)। এর অর্থ ব্যক্তি তাঁর রবের জন্যে সমস্ত প্রচেষ্টা চালাবে এবং সংগ্রাম করবে, পাশাপাশি অন্যদের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করবে। এটা জিহাদের সাধারণ এবং ব্যাপক অর্থ— যা আমাদের বোঝা আবশ্যক। আমাদের আরও বোঝা আবশ্যক- যুদ্ধ এর এক ধরণের প্রকাশ এবং একটি অর্থ মাত্র। 

তাই ভিত্তি হলো আল্লাহ্‌র ইবাদাত প্রতিষ্ঠা, আর ভিত্তি থেকে বের হওয়া শাখাপ্রশাখা হলো সৃষ্টির সাথে আমাদের সকল আচরণ, ইলম অন্বেষণ থেকে আল্লাহ্‌র দিকে দাওয়াত এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদ করা। তাই আমাদের জন্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— আমাদের এই কাজগুলো মূল যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটা ভুলে গিয়ে কাজগুলোর মধ্যেই নিমজ্জিত হয়ে না যাওয়া। অন্তরের আলেমগণ বলেছেন, আল্লাহ্‌র পথে যাত্রায় মানুষের উপর সবচে’ বড় একটি  প্রতিবন্ধকতা হলো উপায়/মাধ্যমই লক্ষ্য হয়ে যাওয়া (means becoming the goal)।  

ইলম অন্বেষণ

লক্ষ্যে পৌঁছার উপায়গুলোর একটি হলো ইলম অন্বেষণ করা। এখন তোমার অবস্থান এখানে। তোমার উচিৎ হবে, আল্লাহ্‌র ইবাদাত প্রতিষ্ঠা করাকে ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা। তাই তোমার ইলম অন্বেষণের জন্যে তাযিম আল্লাহ্‌র ইবাদাত প্রতিষ্ঠা করার সমানুপাতিক। 

এই তাযিমের সাথে অনেকগুলো ফায়দা আসেঃ

  • ইলম অন্বেষণে উঁচু আদাব (ও আখলাক) অর্জন করা। 
  • সময়কে কাজে লাগানো, তাই তুমি এই দুনিয়াতে যে কাজে এসেছে তাঁর বাইরে এক মুহূর্তও ব্যয় না করা। 
  • তোমাকে যা শেখানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বুঝতে পারা এবং শিক্ষকদের প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখা। (আমি এটা বলছি কারণ কোনো ছাত্র শুরুর দিকে কি শিখছে সে ব্যাপারে সংশয়ে থাকতে পারে) 
  • যে উপাদানগুলো তোমার ইলমের ‘আলো’কে রক্ষা করবে, সেগুলোকে ইলমের মাধ্যমে  সংরক্ষণ করা। মূলত তা সম্ভব আমাদের অন্তর এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে। 
  • তুমি যা শিখছ, দ্রুত সেগুলোর উপর আমল যা করা।  

তোমার ইলমের সাথে সম্পর্কিত যা যা আছে— তোমার কিতাব, কিতাবের লেখক, তোমার উস্তাদ—যিনি রাসুলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত একটি মুত্তাসিল (সংযুক্ত) সনদে তোমাকে পড়াচ্ছেন, তোমার শেখার স্থান, এবং শেখার সময়ও যে কাপড়গুলো তুমি পরিধান করো— সেগুলোকে সম্মান করবে।

উপরে যেগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে তাযিম এবং শ্রদ্ধা করলে জ্ঞানের বাস্তবতা থেকে তোমার সত্যিকারের ফায়দাতে বড় প্রভাব আসবে। তাই ইলমের হাকিকত বাদ দিয়ে বাহ্যিকতা নিয়ে ব্যস্ত থেক না। একইসাথে, ইলম এবং ইলমের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখার বাহ্যিক অর্জনও নিখুঁত করার জন্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাও। 

আল্লাহ্‌র দিকে ডাকা

আল্লাহ্‌র দিকে দাওয়াতে সত্যিকারের মাকামে পৌঁছার সঠিক উপায় হলো দাওয়াতের জন্যে কোনো সময় নির্দিষ্ট না করা। এমন কিছু না বলা— “আমি এখন দাওয়াত দেওয়া শুরু করব”, অথবা “আমি এখন দাওয়াত দেওয়া থামাব”। যখন তুমি বলেছিলে “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু”, তখনই আল্লাহ্‌র দিকে ডাকা শুরু হয়ে গিয়েছে। বাহ্যিকভাবে তোমার ডাকা তখনই শেষ হবে, যখন এই আত্মা এই দেহ ছেড়ে যাবে। তাই তোমার প্রথম শাহাদাহ পাঠ হলো দাওয়াতের শুরুর সময়, আর আর শেষ শাহাদাহ পাঠ দাওয়াতের শেষ সময়। একমাত্র পার্থক্য— প্রতিটি ধাপে তুমি ভিন্ন ভিন্ন উপায় এবং পদ্ধতি অবলম্বন করবে। 

এখন তুমি যে ধাপে আছ (ইলমের সত্যিকারের অন্বেষণ, এর উপর আমল করা এবং তোমার আখলাক এবং অন্তরের পরিশুদ্ধি আনা), সেটাও দাওয়াহ। এমন একটি সপ্তাহও যায় না, যখন তুমি আল্লাহ্‌র নিকট উম্মাহর উপর দুর্দশা সরিয়ে নেবার জন্যে এবং উম্মাহকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যে দিনে বা রাতে চোখের পানি ফেলো না। তোমদের নিজেদের ভেতরে শুরা এবং নাসিহার সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো ভাইয়ের নাসিহা এবং হিদায়াহর প্রয়োজন হলে তাকে শালীনভাবে এবং ভালোবাসা দিয়ে পরামর্শ দিতে অন্তর যেন ভারী না হয়ে ওঠে— এই ব্যাপারে তোমার অবশ্যই নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এছাড়াও তুমি ভুল করলে যাতে দ্রুত এবং বিরক্তি ছাড়াই অন্যদের থেকে নাসিহা গ্রহণ করতে পারো— সে ব্যাপারেও তোমার নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। নিশ্চয়ই, অন্যদের নাসিহা দেওয়া এবং অন্যদের থেকে নাসিহা নিতে ব্যর্থ হওয়া তোমার ইলম অন্বেষণে এবং আল্লাহ্‌র নিকটবর্তী হওয়ায় ইখলাসে ত্রুটির লক্ষণ। 

তোমার আশেপাশে প্রত্যেক ধরণের মানুষের সাথে দাওয়াতের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, হোক সে বাজারের বিক্রেতা, কিংবা রাস্তায় ট্যাক্সির ড্রাইভার, কিংবা বাড়ির দারোয়ান, অথবা মসজিদে তোমার পাশে বসা ব্যক্তি। তাদেরকে আল্লাহ্‌র পথে ডাকার ফিকির তাদের থেকে কোনো (দুনিয়াবি) ফায়দা পাওয়ার চিন্তা থেকে অবশ্যই বড় চিন্তার কারণ হতে হবে। এরপর সময় আসলে তোমরা যার যার দেশে ফিরে যাবে, অথবা তুমি যদি গ্রামাঞ্চলে দাওয়াতের জন্যে যাও, তাহলে তোমার জন্যে দাওয়াতের দরজা আরও প্রসারিত হবে। তবে কথা হলো,  এই ধাপে যারা আল্লাহ্‌ পথে দাঈ হতে পারবে না, সে পরবর্তী ধাপেও কখনও সত্যিকারের দাঈ হতে পারবে না। কারণ, অন্তর যদি এখন দাওয়াতের চিন্তা পিছিয়ে দিতে পারে, তাহলে তাঁর অন্তর শুরুতেই দাওয়াতের বাস্তবতা হতে মুক্ত। কারণ এই বাস্তবতা গভীর উদ্বেগের বিষয়। আর এই উদ্বেগ হলো অন্তরের আমল, অন্তরের আমল কখনও পেছানো যায় না। একটা বই কিনতে দেরি করা যায়, দুপুরের খাবার দেরি করে রাতে খাওয়া যায়, (মুসাফিরের জন্যে) যুহরের সালাত দেরি করে আসরে পড়া যায়। তাই, দুনিয়া এবং আখিরাতের বাহ্যিক বিষয়াদি (যেমনঃ কেনা-বেচা না সালাত) দেরি করা যায়। কিন্তু অন্তরের আমল, হোক দুনিয়াবি বা আখিরাতি, কখনোই দেরি করা যায় না। 

কোনো ব্যক্তি যে অন্যকে ভালোবাসে, তাঁর জন্যে বলা সম্ভব না যে “আমি তোমাকে ভালোবাসায় দেরি করব।” একইভাবে, দাওয়াত হলো এক গভীর উদ্বেগ এবং অন্তরের আমল। তাই তুমি যদি দাওয়াতে দেরি করতে সক্ষম হও, তাহলে তুমি এই গভীর উদ্বেগকে দেরিতে বাস্তবায়িত করতে সক্ষম। আর তুমি যদি একে পিছিয়ে দিতে সক্ষম হও, তাহলে তুমি সত্যিকারের দাঈ নও, তুমি কেবল বাহ্যিকভাবে দাঈ!

আরবদের একটি বিদআত ছিল, যদি কোনো মানুষ মারা যেত, ঘরে ঘরে নারীদের শোক, আহাজারি এবং কান্না শুনা যেত। ঘরে নারীর সংখ্যা কম হলে অন্য নারীদের ধার করে আনা হত। একবার এমন তিনজন নারীকে এক মৃতের বাড়িতে  ধার করে আনা হয়। তাঁরা এসে আহাজারি এবং কান্না শুরু করে। ঘরের মানুষেরা এরপর তাদেরকে (কান্না থামিয়ে) বাড়ির সামনে জানাযার জন্যে অপেক্ষা করতে বলে। জানাযা শেষ হওয়ার পর তাদের আবার শুরু করতে বলা হয়। এর কারণ হলো, উনারা ছিলেন “ধার করে আনা নারী”। কিন্তু যিনি/যে মারা গেছেন, তাঁর মা-কে কখনও কাঁদতে দেরি করতে বলা যাবে না, কারণ তাঁর কান্না সন্তান চলে যাবার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে। এজন্যে আরবরা বলত, “নিজ কোলে মারা যাওয়া সন্তানের মা, আর আহাজারির জন্যে ভাড়া করা নারী এক নন।” তাই যিনি আল্লাহ্‌র পথে ডাকছেন, তাঁরও অধিক চিন্তিত হওয়া প্রয়োজন, আরও গভীরভাবে দ্বীনের জন্যে কাঁদা প্রয়োজন, সেই মায়ের চেয়েও বেশি— যার কোলে সন্তান মারা গিয়েছিল। এ ব্যতীত তুমি কখনোই দ্বীনের সত্যিকারের দাঈ’ হতে পারবে না। 

পশ্চিমে আমাদের সমাজে বক্তৃতা কিংবা উপদেশ দেবার মত মানুষের অভাব নেই। প্রত্যেক মসজিদে তুমি এমন মানুষ পাবে যারা খুতবা এবং গণবক্তৃতা দিতে পারে, কিন্তু তবুও আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাই না। এসব বক্তৃতা আর উপদেশ দ্বারা সমাজের পরিবর্তন আসে না। কারণ এমন বেশিরভাগ বক্তব্য হলো সেই ধার করা নারীদের আহাজারির মত। উম্মাহর খুবই খুবই খুবই খুবই অল্প কিছু মানুষ কোলে মারা যাওয়া সন্তানের মায়ের মত কথা বলতে পারে। তাই দাওয়াহ দিতে দেরি করো না। তার মানে তুমি জ্ঞান-অর্জনকে অবহেলা করবে, সেটাও নয়। বরং দাওয়াহ থেকে তোমার জ্ঞানার্জন করবে।

জিহাদ মধ্যমপন্থা

কোনো ব্যক্তি যে দাবি করে সে দ্বীনের জন্যে কাজ করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ্‌র পথে জিহাদের ব্যাপারে ভাবে না— তাহলে হয় তাঁর কোনো বুঝ নেই, অথবা সে সত্যবাদী এবং মুখলিস মানুষ নয়। তবে জিহাদের ব্যাপারে মানুষ দুটো বাড়াবাড়ির দিকে গিয়েছে, এবং উভয়ই ভুল করেছে। একদল জিহাদের ধারণা থেকে বুঝে যে, আমাদেরকে অবশ্যই সকল কাফির/অমুসলিমদেরকে হত্যার জন্যে তরবারি তুলার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। অন্যদল মনে করে, আমাদের তাদের সবার সাথেই ভদ্র, দরদী থাকতে হবে, সবাইকে ভালবাসতে হবে— আর এটা করেই জিহাদ হবে। অবশ্যই, উভয় দলই ভুলে নিমজ্জিত। বাস্তবে আমরা এমন কোনো জাতি নই, যাদের লক্ষ্য কাফিরদের হত্যা করা, আবার আমরা এমন জাতিও নই যারা কুফফারদের শর্তহীনভাবে ভালোবাসবে। যখন যুদ্ধের সময় আসবে, আমরা শুধু যাদের সাথে আল্লাহ্‌র জন্যে যুদ্ধ করি, তাদের সাথে যুদ্ধ করব।

সায়্যিদিনা আলি (আল্লাহ্‌ তাঁকে সম্মানিত করুন) এক কাফিরের সাথে যুদ্ধ করছিলেন। যুদ্ধের সময়ে সায়্যিদিনা আলি তাকে ভুপাতিত করে ফেলেন এবং মারার জন্যে তরবারি উঁচিয়ে ধরেন। যখনই কাফির বুঝতে পারল তাকে মেরে ফেলা হবে, সে সায়্যিদিনা আলির মুখে থুতু মারে। সাথে সাথে সায়্যিদিনা আলি তাকে ছেড়ে দিয়ে তাঁর পথে চলে যায়। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, “কেন তুমি তাকে ছেড়ে গিয়েছিলে যেখানে আল্লাহ্‌ পরিষ্কারতই তোমাকে তাঁর উপরে শক্তি দিয়েছিলেন?” সায়্যিদিনা আলি উত্তরে বলেন, “আমি যুদ্ধ করছিলাম আল্লাহ্‌র জন্যে। সে যখন আমার মুখে থুতু মারে, আমার মনে হয় আমি যদি এখন তাকে মারি, সেটা আমার ব্যক্তিগত প্রতিশোধ এবং থুতুর কারণে হবে।”

এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কারও সাথে ব্যক্তিগত কারণে যুদ্ধ করা আর আল্লাহ্‌র শত্রু হবার কারণে কারও সাথে যুদ্ধ করার মধ্যে পার্থক্য করা ওয়াজিব। যদি কোনো মুমিন কোনো কাফিরের সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে সে এই কারণে যুদ্ধ করবে না যে উক্ত কাফির তাকে ঘৃণা করে, অথবা কাফির তাঁর পিছে ষড়যন্ত্র করছে, অথবা উক্ত কাফির তাঁর উপর জিততে চায়। সে শুধু যুদ্ধ করবে এই কারণে যে সে আল্লাহ্‌র শত্রু, যুদ্ধের সময় এসে গেছে, এবং আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে আদেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আমাদের এমন কিছু মানুষ আছেন যারা বলে, “আমাদের অবশ্যই সকল কাফিরদের ভালবাসতে হবে এবং সম্মান করতে হবে। তাঁরা সুন্দর মানুষ এবং তাদের মধ্যে অনেক ভালো জিনিস রয়েছে।” যারা এমন বলে, তাঁরা হক এবং বাতিলের মিশ্রণ করে ফেলেছে, ঠিক যেভাবে যারা ঠিকভাবে না বুঝে এবং ফারাক না করেই বলে “আমাদের সকল কাফিরদের মারতে হবে”— তাঁরাও হক এবং বাতিলের মিশ্রণ করে ফেলেছে।

কোনো সত্যিকারের মুমিনের জন্যে কোনো কাফিরকে ভালোবাসা অসম্ভব। “আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোন সম্প্রদায় তুমি পাবে না যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতাকারীদেরকে ভালবাসে।”  (কুরআন, ৫৮ঃ২১) এটা বলার পাশাপাশি, আমরা তাদের জন্যে ভালোকে ভালবাসি। তাদেরকে ভালোবাসা আর তাদের জন্যে ‘ভালো’কে ভালোবাসার মধ্যে পরিষ্কার ফারাক বিদ্যমান। তুমি যদি বলো তুমি তাদের ভালোবাসো, তাহলে তুমি তোমার সামনে যাতকে (সত্তা) ভালোবাসার দাবি তুলছ, কিন্তু মুমিন আল্লাহ্‌র যাত বাদে অন্য কোনো যাতকে ভালোবাসে না। যদি তুমি তাদের মধ্যে ভালো গুণাবলিকে ভালোবাসো এবং পাশাপাশি চাও যে এই ভালো গুণের অধিকারী আগুন থেকে রক্ষা পাক, এবং এই গুণগুলোকে আল্লাহ্‌র পথে ব্যবহার করুক, তাদের দিকে রাহমার চোখে এবং তাঁরা জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাক এই আকাঙ্খার দৃষ্টিতে তাকাও, কারণ তুমি জানো এটা আল্লাহ্‌কে খুশি করে, তাহলে তুমি বুঝতে পেরেছ কিভাবে তাদের সাথে আচরণ হওয়া উচিৎ।

তাই আমরা সকল অমুসলিমদের প্রথমত আল্লাহ্‌র সৃষ্টি হিসেবে দেখি। আর মুসলিম হিসেবে আমরা আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকে ভালোবাসি। তাই আমরা কাফিরদের ভালবাসি না, বরং আমরা আল্লাহ্‌র সৃষ্টিকে ভালোবাসি। আমরা তাদেরকে আল্লাহ্‌র পথে আধ্যাত্মিক পাথেয় হিসেবে হিসেবে দেখি, আল্লাহ্‌র কাছে যাবার পাথেয় হিসেবে দেখি। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমার দ্বারা যদি আল্লাহ্‌ একজন মানুষকে হিদায়াত দেন, তাহলে সেটা পুরো পৃথিবী এবং এর মাঝে যা আছে তা থেকে উত্তম।” 

তাই আমরা তাদের সাথে এই ভারসাম্যের সাথে আচরণ করি, যার ভিত্তি হলো তাদের জন্যে দয়া ও সহানুভূতির উপস্থিতি এবং তাদেরকে আগুন থেকে রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা থাকা। কেবল এভাবেই আমাদের তাদের সাথে আচরণ করা উচিৎ। তাদের মধ্যে প্রভাবশালী আমাদের দাওয়াতে উপকার করতে পারবে এই কারণে আমরা তাযিম করিনা, না আমরা তাদের মধ্যে মিসকিনদের সাথে উদার কারণ আমরা তাদেরকে সত্তাগতভাবে ভালোবাসি। বরং আমরা তাদের প্রভাবশালী, গরিব, অসুস্থ, তরুণ— সবার সাথে দয়ার সাথে আচরণ করি। আর দয়ার সাথে কারণ আল্লাহ্‌ এভাবেই ভালোবাসেন। 

আমরা তাদের সাথে এমন পদ্ধতিতে আলোচনা করব যা তাদের আকল বুঝতে পারে, এমন মাধ্যম ব্যবহার করব যার সাথে তাঁরা পরিচিত— যতক্ষণ না এগুলো আমাদের পবিত্র ধর্মে নিষিদ্ধ। ব্যাপারটা এমন নয় যে, এগুলো ছাড়া আর মাধ্যম নেই। বরং কারণ এই মাধ্যমগুলো আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ভালোবাসেন। তাই যদি এমন সময় আসে, যখন তাদের কারও সাথে অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করা আল্লাহ্‌র নিকট অধিক সন্তোষজনক হবে, সেটা গ্রহণ করতে আমরা সেকেন্ডের জন্যেও দ্বিধা করব না। মূলনীতি হলো আমরা প্রসারিত এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করবো, সবার সাথে রাহমা থাকবে, মুসলিম থেকে কাফির। এরপর যদি এমন পরিস্থিতি আসে যখন তাদের সাথে শক্ত আচরণ করা দরকার, এমনকি সেটা যুদ্ধ পর্যন্তও যদি পৌঁছে, তাহলে আমরা পূর্বের ভদ্র এবং রাহমার পদ্ধতির কারণে আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালনে দেরি করব না।

আবু বকর (রা)-এর একজন সন্তান মক্কায় থাকতে ইসলাম গ্রহণ করেননি। তোমরা জানো,বাবার প্রতি ছেলের টানের চেয়ে ছেলের প্রতি বাবার টান অনেক গভীর হয়। মক্কায় থাকতে সায়্যিদিনা আবু বকর (রা) তাঁর ছেলেকে ভদ্রভাবে, ভালোবাসার সাথে ইসলামের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি তাকে ইসলামে আনার জন্যে সবচেয়ে উত্তম এবং মহৎ পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করেন, তবুও আল্লাহ্‌ তাঁর ভাগ্যে তখনও ইসলাম রাখেননি। সায়্যিদিনা আবু বকর (রা) পরবর্তীতে হিজরত করেন এবং বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর ছেলেও বদরের দিনে বের হয়, কিন্তু সে ছিল কাফেরদের পক্ষে। সে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল, যাতে বাবার সাথে সম্মুখযুদ্ধে অংশ না নেওয়া লাগে। পরে সে যখন ইসলাম গ্রহণ করে, তখন তাঁর বাবাকে বলে, “হে আমার পিতা, বদরের দিনে আমি তোমাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছিলাম যাতে তোমার সাথে যুদ্ধ না করা লাগে।” সায়্যিদিনা আবু বকর (রা) উত্তর দেন, আর যদি আমি সেদিন (ময়দানে) তোমাকে পেতাম, তবে তোমাকে মেরে ফেলতাম।”

এর কারণ কি? আমাদের এই সূক্ষ্ম পয়েন্টটি বুঝতে হবে। সন্তানের আমল যখন আল্লাহ্‌র দাসত্বের উপর ভিত্তিশীল ছিল না, বরং (পিতার) প্রতি করুণার উপর ভিত্তিশীল ছিল, এবং তাঁর যুদ্ধের কারণ ছিল কেবল সম্মান, গৌরব এবং আসাবিয়্যাহ, তখন সে এমন আচরণ করেছে। সে তাঁর আবেগের নিকট দাস ছিল। অন্যদিকে, (মক্কায়) সায়্যিদিনা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাজ, ভালোবাসা এবং আবেগ তাঁর নিজের জন্যে ছিল না, বরং তাঁর রবের জন্যে ছিল। তাই যখন সময় এসেছে, আল্লাহ্‌র আনুগত্যে সন্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে, তাই নিজ সন্তানের মৃত্যু হলেও তিনি ছাড় দিতেন না। কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার সঠিক ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের এই পার্থক্য করা প্রয়োজন। 

তাই, জিহাদের (সঠিক) বুঝ হলো কাফিরদের হিদায়াহ এবং (জাহান্নাম থেকে) পরিত্রাণ পাওয়ার মাধ্যম প্রতিষ্ঠিত করা, শুধু শুধু যুদ্ধ করা নয়। অল্প কিছু ক্ষেত্রে তাদের সাথে যুদ্ধ হয়, আর এর লক্ষ্য যারা হিদায়াহ পৌঁছানোর পথে বাঁধা দিচ্ছেন, তাদের জুলুম থেকে রক্ষা করা। আমরা প্রতিশোধের জন্যে, অথবা কষ্ট দেওয়ার জন্যে লড়ি না। মুসলিম এই কারণে যুদ্ধ করে না যে কাফির তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু, অথবা কাফির আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, অথবা কারণ কাফির অন্য মুসলিমদের হত্যা করেছে। মুসলিম কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করে কারণ সে অন্যদের নিকট হিদায়াহ পৌঁছানোকে আটকিয়েছে এবং হিদায়াতের পথে বাঁধা হয়েছে। আবারও বলছি, মুসলিম শুধু প্রতিশোধের জন্যে অথবা শুধু কাফিররা অন্য মুসলিমদের হত্যা করার জন্যে যুদ্ধ করে না। আমি যা বললাম, এই ব্যাপারে গভীরভাবে ফিকির করো! 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, তিনি তখন উহুদে মুসলিমদের হত্যার প্রতিশোধ নেননি, যদিও আল্লাহ্‌ সে মহান বিজয়ের দিনে (আল-ফাতহ) তাকে কাফিরদের উপর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরা ছিল সেই কাফিররা, যারা তাঁর সাহাবী (রা) এবং নিজের পরিবারের মানুষদের হত্যা করে! এরা ছিল সেই কাফিররা যারা অন্যদের নিকট হিদায়াহ পৌঁছার পথে বাঁধা হয়ে ছিল। এরা ছিল সেই কাফিররা যারা (নবীজীর চাচা) সায়্যিদিনা হামযার বুক এবং পেট ফেড়েছিল। এরা সেই কাফির যারা সায়্যিদিনা হামযা (রা) এর কলিজা খেয়েছিল। সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, বস্তুত যারা (হিন্দ এবং ওয়াহশি) হামযাকে হত্যা করার ব্যাপারে ষড়যন্ত্র করেছিল, তাদের ইসলামকে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পরও তাদের কাউকে হত্যা করেননি। 

যদি আমরা মুসলিম রক্তের প্রতিশোধ নেওয়াকে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণ হিসেবে মনে করতাম, তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যে উপযুক্ত হত মক্কায় ঢুকে সাথে সাথে ওয়াহশি বা হিন্দকে হত্যা করার আদেশ দেওয়া। কিন্তু মুসলিমদের ব্যাপার প্রতিশোধের না, বরং তা হিদায়াত এবং এর আলো ছড়াবার ব্যাপার। মুসলিমরা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে মানবজাতির নিকট হিদায়াতের চিঠি। তাই যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতেন যে কারও হিদায়াহ পাবার ব্যাপারে আশা আছে, তিনি বলতেন, “যাও, কারণ নিশ্চয়ই তুমি মুক্ত”। আর আমাদের আচরণ এমন হওয়া আবশ্যক। যেদিন আমি যুদ্ধের ময়দানের কোনো শত্রুর সাথে সাক্ষাৎ করব, যে আফগানিস্তানে মুসলিমদের মেরেছে এবং আমি বুঝতে পারবো সে হিদায়াহ চাইতে পারে, আমি তাঁর সাথে পূর্ণ রাহমার সাথে আচরণ করব। এটা আমাদের জন্যে বুঝা আবশ্যক। তাই আমাদের জিহাদে চূড়ান্ত এবং মৌলিক লক্ষ্য তাদের হিদায়াত, এমনকি তাদের সাথে আমরা শারীরিকভাবে যুদ্ধরত অবস্থাতেও! 

এগুলোর সবই আমরা আমাদের রহমতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাহিনী থেকে বুঝতে পারি, যখন তিনি [রাসুলুল্লাহর] ভালোবাসার ব্যক্তির পুত্র, ভালোবাসার উসামা বিন যাইদের  ব্যাপারে হতাশ হন। তাকে এই নাম  (حِبُّ ابن حِب رسول الله)  দেওয়া হয়েছিল কারণ আল্লাহ্‌র রাসুল (সা) তাকে প্রচুর ভালবাসতেন। উসামা যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। যুদ্ধের সময়ে তাঁর এক শত্রু ফসকে পড়ে যায়, তো উসামা বিন যাইদ তাকে হত্যা করার জন্যে তরবারি তুলেন। সাথে সাথে শত্রু চিৎকার দিয়ে বলেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।” এরপরও উসামা তাকে আঘাত করে মেরে ফেলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন এটা শুনতে পান, তিনি উসামাকে দোষারোপ এবং তিরস্কার করতে থাকেন। তিনি বলেন, “তুমি তাকে শাহাদাহ পাঠ করার পর হত্যা করেছ?!” উসামা উত্তরে বলেন, “হে আল্লাহ্‌র রাসুল, সে তো শুধু তরবারির ভয়ে পাঠ করেছে!” রাসুলুল্লাহ (সা) শুনে বলেন, “উসামা, তুমি কি তাঁর অন্তরের ভেতরে দেখেছ?!” 

এই কাফিরই হয়ত ঐদিনে অনেক মুসলিমকে হত্যা করেছে, এবং সে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত ছিল। তবুও সে শাহাদাত পাঠ করার সাথে সাথেই, এমনকি সেটা নিফাকির সাথে হলেও, উসামাহ (রা) তাকে হত্যা থেকে বিরত না থাকায় রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব হতাশ হয়ে পড়েন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই দিনের বাকি অংশে তাকে দোষারোপ করতে থাকেন, ফলে উসামাহ (রা) বলে বসেন, “আমি যদি এই দিনের পর মুসলিম হতাম!” (অর্থাৎ তিনি আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন এমন কিছুই যাতে তাঁর জীবনে না ঘটত এবং তিনি ইসলামে নতুন করে শুরু করতে পারতেন।)

সায়্যিদিনা উসামাহ (রা)-কে দোষ দেবার জন্যে এই ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। বরং এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি আছে যা আমাদের বোঝা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহর (সা) একজন সাহাবীর রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুর্ঘটনাকে বরং সাহাবীদের [রা] সমাজের নিখুঁত হওয়ার দিক থেকে দেখা হয়। কারণ, সাহাবীদের (রা) সমাজের উদ্দেশ্য হলো আমরা তাদের অনুসরণ করব। তাই তাদের মধ্যে যদি কোনো ভুল/দুর্ঘটনা না হত, তাহলে আমরা বুঝতে পারব না আমাদের সময়ে বা ভবিষ্যতে কেউ ভুল করলে তাঁর সাথে কি করা উচিৎ। তাই বাস্তবে কোনো এক সাহাবির (রা) ভুল সামাজিক পর্যায়ে পরিপূর্ণতা। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো, শেখার বাস্তবতা যাতে আমাদের নিকট সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়।

এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের অন্তরে এই বুঝ শক্ত করে দিয়েছেন যে, এমনকি যুদ্ধের সময়েও আমাদের লক্ষ্য তাদের হিদায়াত। তাই যদি আমাদের শত্রু হিদায়াত পাবার ইঙ্গিত দেখায়, এমনকি সেটা বাস্তবে না হয়ে কেবল বাহ্যিকভাবে হলেও, তখন আমাদের এবং তাদের মধ্যে যুদ্ধ থেমে যায়। তাই “তুমি কি তাকে শাহাদাহ পাঠের পর হত্যা করেছিলে?” এই লাইনের অর্থ হলো— আমাদের যুদ্ধের প্রণোদনা যাতে আমাদেরকে যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য থেকে অন্ধ না করে দেয়। আর আসল উদ্দেশ্য তাদের হিদায়াত।

এই কারণে আলি (রা) এর পুত্র সায়্যিদিনা হুসাইনের (রা) কথা উল্লেখ উল্লেখ করা হয়। তাঁর সৈন্যরা ভুলপথগামী এবং পলাতক মুসলিমদের বাহিনীর সাথে মিলিত হয়, যারা হুসাইন (রা)-কে হত্যা করতে চেয়েছিল। হুসাইন (রা) তাদের দিকে তাকান, তাঁর চোখ দিয়ে পানি নেমে আসে। হুসাইন (রা) এবং তাঁর সৈন্যের সংখ্যা নারীসহ (অ-যোদ্ধা) ৮০ এর বেশি ছিল না। অন্যদিকে বিপরীত দিকে সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৩০০০ এর বেশি। মনে রেখো, হুসাইন (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) এর কন্যার সন্তান, রাসুলুল্লাহর সুন্দর সুগন্ধি (‘রায়হানাত রাসুলিল্লাহ’, রাসুলুল্লাহ (সা) নিজে তাকে এই নাম দিয়েছিলেন), জান্নাতের তরুণদের সর্দার, যার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্‌র নিকট প্রার্থনা করেছিলেন, “হে আল্লাহ্‌, তাকে ভালোবাসো যে (হুসাইনকে) ভালোবাসে।” 

হুসাইন (রা)-কে বাইয়াত দেবার পর তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বসে। তাঁরা তাদের ভূমির মানুষ থেকে ১৭০০০ সই সংগ্রহ করে এবং হুসাইন (রা)-কে আহ্বান জানায়, “এসো, আমাদের নেতৃত্ব দাও”। যখন তিনি বেরিয়ে এসে দেখলেন ৩০০০ সৈন্যের এক বাহিনী, যারা তাকে হত্যা করতে চায়। তাদের বেশিরভাগই পূর্বে বায়াত দিয়েছিলেন। তাঁরা ছিল এমন একদল মানুষ, যারা দুনিয়ার যমীনে নিকৃষ্টতম অপরাধ করার পথে এগুচ্ছিল— রাসুলুল্লাহর (সা) পরিবারের একজনকে হত্যা করা! 

হুসাইন রা যখন তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শত্রুদের দিকে তাকাতে শুরু করেন, তিনি কাঁদতে শুরু করেন। তাঁর বোন যাইনাব তাকে কাঁদতে দেখে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কাঁদছ কেন, হুসাইন? তুমি কি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছ? নিশ্চয়ই তুমি তোমার শহিদ ভাই হাসানের জন্যে, তোমার শহিদ পিতা আলি, তোমার মা ফাতিমা, তোমার দাদা রাসুলুল্লাহ (সা) এর জন্যে অগ্রসর হচ্ছ!” হুসাইন তাঁর দিকে ফিরে বলে, “ধিক তোমাকে, যাইনাব! হুসাইন মৃত্যুর জন্যে ভীত নয়!” উনি তখন জিজ্ঞেস করেন,
তাহলে তোমার চোখে আমি কি দেখছি?” সে উত্তর দিল, “হে যাইনাব, আমি এই যাদের দিকে তাকালাম তাঁরা আল্লাহ্‌র চুক্তির সাথে বেঈমানি করেছে, আমি দেখছি যে তাঁরা আমাকে হত্যা করবে, আর যদি অনধিকারবশত করে থাকে, তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে— যেখানে আমি আশা করি তাঁরা বরং জান্নাতে যাবে।” 

জিহাদের ব্যাপারে এই অর্থ অনুধাবন করা তোমার জন্যে দায়িত্ব। যদি তুমি এটা অনুধাবন করতে পারো, তোমার অন্তর থেকে বাহ্যিক মাধ্যম বা আহলুল-আসবাবের বিভ্রমকারী ক্ষমতার বিষয়টি দূর করতে পারো, এর সাথে দাওয়াহ এবং পবিত্র ইলমের বাস্তবতা যুক্ত করতে পারো, এগুলোকে তুমি তোমার সৃষ্টির মৌলিক উদ্দেশ্যের মাধ্যম হিসেবে নিতে পারো— যে উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ্‌র ইবাদাত করা, তাহলে তুমি এই যুগে আল্লাহ্‌র নৈকট্যের পর্যায়ের দিক থেকে এমন একজন মানুষ হতে পারবে, যাকে আল্লাহ্‌ বাছাই করেছেন এবং উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন। আর তুমি এই লক্ষ্যের জন্যেই এসেছ, যদি তুমি বুঝতে পারো। আর আল্লাহ্‌র নিকট তোমাকে এটাই চাইতে হবে— এই রমযান মাসের দিনগুলোতে এবং জীবনের বাকি অংশে।


অনুবাদ- ফারশিদ খান

ছবির সূত্র: Muhammad Berkati, Indonesia – Arts and Culture Shortlist of Open segment of 2015 Sony World Photography Awards

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *