শায়খ বিন বাযের (র) সান্নিধ্যে..

–ড. ওয়ালিদ বাসইয়ুনি

সেবার আমি শাইখ ইবনে বাযের সাথে সাক্ষাতে রিয়াদে গিয়েছিলাম। সাথে ছিল সৌদিতে আমাদের শহর দাম্মামে অনুষ্ঠিতব্য একটি কনসার্টের দাওয়াতের কপি। সত্যি বলতে, আমি সংশয়ে ছিলাম যে আমার এই সাক্ষাত আদৌ কাজে দেবে কিনা, কারণ এমন কনসার্টের পেছনে উক্ত এলাকার প্রভাবশালি মানুষদের সমর্থন ছিল। তখন পর্যন্ত আমি শাইখ বাযের সাথে মাত্র কয়েকবার দেখা করেছিলাম এবং তিনি আমাকে চিনতেন বলেও মনে করতাম না, কারণ কলেজে তখন নতুন নতুন পা ফেলেছি। অতএব, কলেজের নতুন নতুন আসা আমি তখন সৌদি আরবের [প্রধান] মুফতির অফিসে ঢুকছিলাম।

তাঁর অফিস সাদাসিধে হলেও বড় ছিল, প্রায়ই ৭০জন মানুষ আঁটে এখানে আমার হিসাবমতে। রুমের মাঝখানে একটি বড় টেবিল ছিল-ফাইলভর্তি- বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চিঠি। তাঁর পাশে একটি ফোন ছিল, যেটা সারাক্ষণ বেজেই চলছিল- কারণ বিচারক/ফকিহ এবং তলিবুল ইলম থেকে শুরু করে সাধারণ মুসলিমরা শাইখকে ফতওয়ার জন্যে ফোন করত। আমি বুঝতে পারলাম যে শাইখের উপস্থিতিতে আমার অবস্থান আসলে খুব বিশেষ ধরণের কিছু ছিল না।

তিনি রহিমাহুল্লাহ সবার থেকে শুনতেন, যারা অনুরোধ করতো। টেবিলের পরে একটি আরামদায়ক চেয়ার ছিল, সেখানে তিনি বসতেন। সেটার দুপাশে দুটো চেয়ার এবং বিপরীত দিকে দুটো চেয়ার থাকত। প্রত্যেক পাশে একজন করে সহকারি বসতেন, একজন তাঁর দেওয়া জবাবগুলো লেখার জন্যে এবং আরেকজন চিঠি পড়ে শোনানোর জন্যে– কেননা শাইখ অন্ধ ছিলেন। আর যারা সাক্ষাত করতে আসতো, তাঁরা বিপরীত দিকের চেয়ারগুলোর একটিতে বসতো। শাইখ কখনো টেবিলের পেছনে বসতেন না, কারণ তিনি চাইতেন না যে তাঁর আর শ্রোতার মধ্যে বাঁধা থাকুক।

তিনি আমাদের এলাকায় দাওয়াহ, আমার পড়াশোনা এবং আমার এলাকায় সেসকল শাইখদের চিনতেন তাদের ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। এরপর তিনি বললেন, “ছেলে, তোমাকে আমি কিভাবে সাহায্য করতে পারি?” আমি তাকে সামনের কনসার্টের ব্যাপারে জানালাম, শুনে তিনি বললেন- “লা হাওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। আমি দেখব কি করা যায়।”

আমি ভাবলাম আমার কাজ শেষ, তাই ‘জাজাকাল্লাহু খাইর” বলে উঠতে লাগলাম- কিন্তু তিনি আমাকে অপেক্ষা করতে বললেন। তিনি প্রিন্স নাইফ [রহিমাহুল্লাহকে] ফোন করলেন, যিনি তখনকার অন্তর্বর্তী মন্ত্রি। বিভিন্ন কথার পাশাপাশি বললেনঃ “আমার এখানে মাশাইখদের একজন আছেন। তিনি আমার কাছে এসে একটি কনসার্টের ব্যাপারে নালিশ করেছেন, যেটা দাম্মামে হবে এবং আমি পূর্বপ্রদেশের গভর্নরের সাথে একইরকম ইস্যু নিয়ে বহুবার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি আমার উপদেশ শোনেননি। তাই আমি চাচ্ছি আপনি ব্যাপারটা দেখেন এবং উনার সাথে কথা বলুন। আমি আপনার ফোনের জন্যে অপেক্ষা করব।” শাইখ তাঁর জন্যে দুআ করলেন এবং ফোন রাখলেন। আমি অনেকখানিই ভয় পেয়ে গেলাম যখন বুঝতে পারলাম উনি সৌদি আরবের অন্তর্বর্তী মন্ত্রির সাথে কথা বলছিলেন, আর এই স্তরের আলাপ-আলোচনার জন্যে আমি অনেক ছোট এবং অ-গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিলাম!

শাইখ আমাকে আবারও অপেক্ষা করতে বলে বললেন- “আল্লাহ্‌ যেন আজ আমাদের একটি ভাল জবাব শোনান। আল্লাহ্‌ যাতে তাকে এই হারাম বন্ধ করার ব্যাপারে হিদায়াত দেন।” যখন আমি বসে অপেক্ষা করছিলাম, আমি এমন কিছুর সাক্ষী হলাম, যা আমি আমার জীবনে শাইখ ইবনে বায ব্যতীত অন্য কোনো শাইখ হতে পাইনি।

তাঁর সহকারি মৌরিতিনিয়ার এক নারীর চিঠি পড়ে শোনালেন। তিনি শাইখ ইবনে বাযকে অনুরোধ করছেন, তার কলেজে পড়া ছেলের জন্যে আর্থিক সাহায্য বহাল রাখতে। উনি বলেছেন, যদি এই আর্থিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার সন্তানের লেখাপড়া থামিয়ে পরিবারের যোগানের জন্যে কাজ করা লাগতে পারে। উনি লিখেছেন, ” আল্লাহ্‌র পর একমাত্র আমি আপনার কথাই চিন্তা করতে পারি সাহায্য করার জন্যে।” তার সন্তানের পড়া শেষ হতে আর মাত্র দুই বছর বাকি ছিল। শাইখ তাঁর সহকারিকে নির্দেশ দিলেন উনাকে দুই-বছরের জন্যে আর্থিক সাহায্য দেবার জন্যে। সহকারি উত্তর দিলেন- “ডোনেশন ফান্ডে কোন অর্থ নেই।” ইবনে বায তখন তাকে যাকাত ফান্ড থেকে দিতে বললেন, কিন্তু উত্তর ছিল একই! শাইখ তখন বললেন, “তাকে আমার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে দাও।” কিন্তু এবারও সেই একই ধাঁচের উত্তর- “এই মাসে আপনার আর কোন অর্থ বাকি নেই, শাইখ। আপনি সব অর্থ এরকম জায়গায় দিয়ে দিয়েছেন।” পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে, শাইখ তাঁর বেতনের একটি অংশ দানের জন্যে রাখতেন, এবং মাসের মাঝখানে সেই অংশ পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর শাইখ বললেন, ” আমার নামে একটি লোন নাও, সেখান থেকে মহিলাকে টাকা পাঠিয়ে দাও এবং আমি আশা করি আমি দ্রুতই এই লোন পরিশোধ করতে পারব।” সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি, যিনি চাইলে লাখটা ওজর দেখাতে পারেন, মৌরিতিনিয়ার একটি মহিলার জন্যে লোন নিচ্ছেন- যা দ্বারা কোনোই পার্থিব সুবিধা বা স্বার্থের সুযোগ নেই- আমি সিম্পলি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে আমি কি দেখছি!

ঘণ্টার আগেই তিনি প্রিন্সের নিকট থেকে ফোন পেলেন-উনি কনসার্টটি বাতিল করে দিয়েছেন এবং নিশ্চিত করেছেন যাতে এরুপ ঘটনা ভবিষ্যতে আর না ঘটে। শাইখ খুবই খুশি হয়েছিলেন, যার ছাপ আমি তাঁর মুখে দেখতে পাচ্ছিলাম এবং তিনি বারবার “আলহামদুলিল্লাহ” বলছিলেন। এরপর তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিলেন, ব্যাপারটা এমন যেন আমিই সেই কনসার্ট বাতিল করেছি! আমাকে সত্যের পক্ষে দাঁড়াবার জন্যে এবং ভুল কিছু দেখলে সেটার ব্যাপারে সক্রিয় হবার অনুপ্রেরণা জোগালেন। এরপর তিনি আমাকে তাঁর সাথে দুপুরের খাবারে অংশ নিতে বললেন। আমি তাঁর হতে আরও মহৎ শিক্ষা পেয়েছি- যেগুলো শীঘ্রই শেয়ার করব বলে আশা করি।

তরুণবয়সে সেদিন যে সম্মান আমি পেয়েছিলাম এবং তিনি আমার ভেতর যে আত্মবিশ্বাসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন- সেটার ফলে আজ আমি এই অবস্থায় এসেছি। গরিব, দুর্বল, কাছের এবং দূরের মানুষদের জন্যে তাঁর যত্ন মহামান্য শাইখ বিন বাযকে সেই মহত্ত্বের আসনে বসিয়েছিল- যে বিশেষত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি, রহিমাহুল্লাহ।


Photo: Kitaabun.com

অনুবাদ- ফারশিদ খান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *