মেকি জ্ঞানের যুগ

শেইন পেরিশ

“আপনি যা জানেন না তা আপনাকে ঝামেলায় ফেলে না। বরং আপনি যেটা নিশ্চিত জানেন কিন্তু আসলে তা নয়, সেটাই আপনাকে ঝামেলায় ফেলে।”

-মার্ক টোয়েন

সম্প্রতি সাংবাদিক ও লেখক কার্ল টারো গ্রিনফিল্ড ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় ‘মেকি সাংস্কৃতিক পান্ডিত্য’ (Faking Cultural Literacy) নিয়ে একটি লেখা লিখেছেন।

তিনি লিখেছেন, “আসলে কিছু না জেনেও অনেক জানার ভান করা কখনোই এতটা সহজ ছিল না। আমরা ফেসবুক, টুইটার ও ই-মেইল নিউজ এলার্ট থেকে সাময়িক ও প্রাসঙ্গিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ নেই অতঃপর তা উগরে দেই।”

গ্রিনফিল্ডের মতামতের একটা প্রভাব চিত্তাকর্ষক: আমাদের সহকর্মীরা আমাদের এড়িয়ে চলবে এই ভয়ে আমরা “আমি জানি না” বলতে কাঁচুমাচু করি। বিষয়টি সাংস্কৃতিক বা পেশাদারী যাইহোক না কেন, এই শব্দগুলো আমাদের শব্দভাণ্ডার থেকে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।

জ্ঞানীর ভান করা বর্তমান সময়ের চেয়ে কখনোই সহজ ছিল না। আপনি সহসা একটা উইকিপিডিয়া পেজে ঢুকতে পারেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে পারদর্শিতার ভান ধরতে পারেন। আপনি এটা কয়েকবার করেও যদি পার পেয়ে যান, তখন এই বিশ্বাস করতে শুরু করেন প্রকৃতপক্ষে যেক্ষেত্রে আপনার কোন খেই নেই আপনি সেক্ষেত্রে মোটামুটি পারদর্শী।

কিছুটা উদ্বেগজনক হল আমরা আসলে প্রতিষ্ঠানিকভাবে জ্ঞানীর ভান ধরাকে উৎসাহিত করছি।

এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করে দেখুন। শেষ কবে আপনি কাউকে মিটিংয়ে “আমি জানি না” বলতে শুনেছেন। যদি এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা কোনো নির্দেশক হয় তাহলে আপনি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় যত উপরে আছেন, সম্ভবত আপনি এই শব্দগুলো ততই কম বলবেন।

কেউই না জানা অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে চায় না। বাস্তবতা সত্ত্বেও, কেউই এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে চায় না যে একটা সিদ্ধান্ত নিতে ৪০ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট পড়া লাগবে এবং তার হাতে সময় আছে মাত্র ৫ মিনিট। 

আমাদের দিনগুলো মাঝে মাঝে ই-মেইলের বিরতি দিয়ে মিটিংয়ে বিভক্ত। আমরা এতটাই ব্যস্ত যে কর্মক্ষেত্রে আমরা উইকিপিডিয়া পেজে চোখ বুলানোর মত কিছু একটা করেই গেম থিওরি বোঝার ভান করি। সহজ কথায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যপূর্ণ মতামত দেয়ার মত সময় আমাদের নেই।

কাজের বেলায় ব্যাপারটা এমন হয়: কোন সামগ্রীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বড় মিটিংয়ের আগে আমরা রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নেই। বেছে বেছে সম্পাদকীয় সারসংক্ষেপ ও শিরোনামগুলো পড়ি। আমরা ভাবি যা ঘটছে সব বুঝে গেছি। আমরা মিটিংয়ে গিয়ে কিছু ব্যাখ্যা করি যা এই তিন রূপের যেকোন একটি হয়: (১) আমরা রিপোর্টটা পড়েছি ও সেটা নিয়ে চিন্তা করেছি এটা বোঝানোর জন্য শুধু শুধু কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা; (২) রিপোর্টের যে সামান্য অংশের ব্যাপারে আমরা কিছু জানি তা বাছাই করে সবাইকে আমাদের বুদ্ধিমত্তার জানান দেয়া; (পারকিনসন’স ল’র খেলা) (৩) দুর্বোধ্য শব্দ ও ধারণা নিয়ে কথাবার্তা বলা যা শুনতে স্মার্ট শোনায় কিন্তু আসলে অর্থহীন।

এগুলো সব বুলশিট! এগুলো উত্তম সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায় না। প্রতিষ্ঠানের উন্নতি করে না। আপনি চালাকি করছেন এই ধারণা তৈরি করার দ্বারা আপনার সাথে প্রতারণা করে। আপনি নিজেকেই বোকা বানাচ্ছেন। আপনি যদি মনে করেন আপনি এ থেকে নিরাপদ তাহলে আপনি আপনার সিদ্ধান্তগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখুন।

আমি রায়ান হলিডে’র সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, “এটা অসততার জন্য খারাপ না। এটা খারাপ কারণ আমরা এই মেকি জিনিসের উপর ভিত্তি করে বাস্তব এবং কখনও কখনও জীবন বদলে দেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকি।” আমরা যা জানি ও যা জানার ভান করি তার পার্থক্য করতে না পারার কারণে আমরা নিজেদের আলসেমি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার শিকারে পরিণত হই।

১৯৬৪ সালে ইতালির গ্যালিলিও সিম্পোজিয়ামে দেয়া লেকচারে ভবিষ্যৎ নোবেল বিজয়ী রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন, “প্রথম নীতি হল আপনি নিজেকে অবশ্যই বোকা বানাবেন না, আর বোকা বানানোর জন্য সবচেয়ে সহজ ব্যক্তি আপনি নিজেই।”

সুতরাং প্রশ্ন আসে কীভাবে আমরা নিজেদের বোকা বানানো এড়াতে পারি?

আপনি যা বলছেন তা জানেন নাকি জানেন না তা বের করতে সাহায্য করার জন্য একটা সহজ কৌশল আছে। আমি এটাকে বলি যেকোন মতামত ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ। এটা দিয়েছেন শার্লি মুঙ্গার, ওয়ারেন বাফেটের বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়িক পার্টনার। তিনি বলেন, “আমি নিজেকে কখনো এমনকিছুতে মতামত দিতে দেইনি যার বিপরীত দিকের যুক্তিগুলো আমি তার চেয়ে ভালো করে জানতাম না।”

এই বিষয়টা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবুন। এর মানে আপনি চোখ বুলিয়ে ভান ধরতে পারবেন না। এর মানে আপনাকে কাজটা করতে হবে। আপনাকে নিজের সাথে সৎ থাকতে হবে। আপনাকে জানতে হবে আপনি কখন আপনার যোগ্যতার বৃত্তের ভেতরে আছেন এবং কখন বাইরে আছেন। আপনাকে আত্মসমালোচনা করতে হবে। এর মানে আপনি যে পয়েন্ট তুলে ধরতে চাইছেন তার বিপরীত দিকটা সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে বেশি জানতে হবে। এর মানে আপনাকে বলতে হবে, “আমি জানি না।”


অনুবাদঃ ওসমান হারুন সানি

মূল লেখা: The Era of Fake Knowledge: Why It’s Never Been Easier To Fake What You Know | Observer

Photo: Goodfon.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *