দাঙ্গা নয় পগরম

-মূল লেখা: রাহুল রামচান্দানি

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কখনোই কোনো হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি।

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হয়নি। 

যেটা হয়েছে তা হল পগরম। পগরম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে ভিন্ন। কোন সম্প্রদায়কে পরিকল্পিত গণহত্যার নামই পগরম। আর স্বাধীনতার পর ভারত শুধু হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী সংগঠনগুলোর দ্বারা সংঘটিত মুসলিমদের পগরম দেখেছে।

আর এটা আমার বানানো নয়। ১৯৬৮ (মোরারজি দেশাইয়ের সুপারভিশনে হওয়া প্রথম গোধরা দাঙ্গা), ১৯৮৪ (যেখানে শিখরা ছিল ভিকটিম, হিন্দুরা হত্যাকারী) ১৯৯২ ও ২০০২ সালের তথাকথিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোর পর জুডিশিয়াল কমিটির তৈরিকৃত রিপোর্ট থেকে আমি এটা পেয়েছি। এই রিপোর্টগুলো বিধানকর্তা কতৃক নিরপেক্ষ তদন্ত, ভিকটিম ও হত্যাকারী উভয়ের সাক্ষ্য, জীবনের ঝুকি নিয়ে চালানো কিছু স্টিং অপারেশন ও সুপ্রিমকোর্টের হাই-প্রোফাইল বিচারপতির দেয়া রায় থেকে তৈরি করা হয়েছে।

এই রিপোর্টগুলো ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। আপনি গুগুল করে এগুলো পড়তে পারেন। রিপোর্টগুলো হল: শ্রীকৃষ্ণ কমিটি রিপোর্ট, কাপুর কমিশন রিপোর্ট, নানাভাতি কমিশন রিপোর্ট, ইউ.সি ব্যানার্জি রিপোর্ট, সাচ্ছার কমিটি রিপোর্ট ইত্যাদি।

যদিও এইসব কমিটির রিপোর্ট কখনোই বড় নেতাদের জেলে ঢুকানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখেনি কিন্তু এইসব পগরমের একটা প্যাটার্ন দাড়া করাতে সক্ষম হয়েছে।

প্যাটার্নটা হল এই:

১. কয়েকটা মুসলিমবিরোধী কর্মকাণ্ড করে মুসলিমদের উত্তেজিত করা। (এটা হতে পারে বাবরি মসজিদ ভাঙা অথবা গোধরা স্টেশনে মুসলিম মহিলাদের লাঞ্ছিত করা)

২. বিচ্ছিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে গোটিকয়েক অপরাধী বা পতিক্রিয়াকারী প্রতিশোধ নিবে এবং হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী সংগঠনগুলোর এই ফাঁদে পা দিবে।

৩. হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী সংগঠনগুলো তখন তাদের খেলা খেলবে এবং মুসলিমদের পগরম শুরু করবে।

৪. এই সংগঠনগুলোর উঁচু জাতের কর্তাদের নির্দেশে মূলত নিচু জাতের হিন্দুরাই হত্যাকান্ড ঘটায়। এভাবেই ব্রাহ্মণবাদী সংঘটনগুলো কাজ করে। উঁচু জাতের সদস্যরা পরিকল্পনা করে নিচু জাতের লোকদের রক্তপাতে লেলিয়ে দেয়। পরে পুলিশ এই ব্রেইনওয়াশ হওয়া নিচু জাতের লোকদের গ্রেফতার করে। উঁচু জাতের গুন্ডারা নির্লজ্জের মত কাজ চালিয়ে যায়।

৫. পুলিশ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সাথে রাজনৈতিক যোগসূত্রের কারণে পশ্চাদে আসন গ্রহণ করে।

৬. নিউজ চ্যানেলগুলো এগুলোকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হিসেবে সম্প্রচার  করে।

৭. বম্বে, মুলক ইত্যাদি ছবির মত নিতান্ত স্টুপিড ছবি তৈরি করে যেগুলোতে হিন্দু-মুসলিম উভয়কেই দোষারোপ করা হয় আর একটা হিন্দু লোককে শান্তির রক্ষক বা দূত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতা কর্তৃক তৈরিকৃত ভয় ও সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত ভয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝার চেষ্টাই করা হয় না। এই ছবিগুলোর এই ন্যারেটিভ পুরস্কৃত হয় আর পপ-কালচারে পগরমকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে আসা হয়। 

দিল্লিতেও একই প্যাটার্ন শুরু হয়েছে।

আমার সন্দেহ হয় আমরা সাধারণ মানুষেরা এই ‘প্রদর্শনী’ চেয়ে চেয়ে দেখা ব্যতীত আর কিইবা করতে পারি?

আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে যেটা করতে পারি তা হল আরএসএস, বাজরাঙ দল, ভিএইচপি মত সংগঠনগুলোকে বর্জন করতে পারি। তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করুন যেহেতু তাদের আর লস্কর-এ-তাইয়্যেবাহ এর মত সংগঠনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

আর এই দেশে সাম্প্রতিক দাঙ্গা বলতে কিছু নেই এটা বুঝুন। আমাদের এই দেশে যেটা হচ্ছে সেটা পগরম।

এই পগরমগুলো উঁচু জাতের হিন্দুদের দ্বারা পরিকল্পিত যেখানে তারা নিচু জাতের হিন্দুদের মুসলিমদের মারার জন্য দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করে। 

হ্যাঁ, আমরা উঁচু জাতের হিন্দু। আমরা জার্মান নাৎসিদের থেকে কম নই। আমাদের পরিচয়ে গর্ব হওয়ার কিছু নেই। আমাদের উচিত নিজেদের অপরাধী মনে করা এবং বিদ্যমান  ত্রুটিগুলো খুজে বের করা।


রাহুল রামচান্দানি ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একজন লেখক। এই লেখাটি উনার ফেসবুক পোস্ট থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।

অনুবাদ- ওসমান হারুন সানি

Photo Artist: Laboni Jongi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *