যালামতু নাফসি…

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আমরা প্রতিদিনই সালাতের শেষ বৈঠকে দুআ মাছুরা নামক সুন্দর একটি দুআ পাঠ করি, যা ছোটবেলাতেই আমাদের মুখস্থ করানো হয়। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগই জানি না, এটি খুব স্পেশাল একটি দুআ। এর কারণ হলো, দুআটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একজন ব্যক্তিকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, নবিজির পরে যাকে এই উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর তিনি হলেন খালিফাতুর রাসুল আবু বকর আস-সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।

তো শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাকে (রাহিমাহুল্লাহ) এই দুআ সংক্রান্ত খুব চমকপ্রদ একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। আর তিনিও নিজের স্বভাব অনুযায়ী এর দীর্ঘ ও বিস্তৃত উত্তর প্রদান করেছিলেন। আমি সেই ফতোয়া থেকে সংক্ষেপে নির্বাচিত কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি।

আবু বকর আস-সিদ্দিক থেকে বর্ণিত, “আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি দুআ শিখিয়ে দিন, যা আমি সালাতে পাঠ করব। তিনি বললেন, বলো,

اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

হে আল্লাহ! আমি নিজের প্রতি অনেক অবিচার করেছি। আর আপনি ছাড়া কেউই পাপ ক্ষমা করতে পারে না। অতএব আমাকে আপনার পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ক্ষমা করে দিন। আমার প্রতি দয়া করুন। আপনিই তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”।[1]

প্রশ্ন হল: “আমি নিজের উপর অনেক যুলম করেছি” – সিদ্দিকের এই কথার ব্যাখ্যা কী? মহান আল্লাহর সামনে দুআর ক্ষেত্রে তো কোনো রূপকের আশ্রয় নেয়া যায় না। সিদ্দিক হলেন অগ্রবর্তীদের ইমাম। অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একথা বলার নির্দেশ দিলেন?! এব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাই। আর কী সেই যুলম, যা সিদ্দিক নিজের সাথে সম্বন্ধ করেছেন এবং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তা বলতে শিক্ষা দিয়েছিলেন?

প্রশ্নকর্তার মনে সম্ভবত এই দুআর ব্যাপারে কিছুটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সে যেন বলতে চাইছে, ‘যুলমান কাসিরান’ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে এমন কোনো পাপ থাকা তো সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর মর্যাদার সাথে খাপ খায় না। কারণ এর ফলে তার সিদ্দিকিয়্যার স্তর প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই সংশয়ের জবাব হল:

শুধু সিদ্দিক (রাহিয়াল্লাহু আনহু) নন, বরং নবি-রাসুলগণও সর্বোচ্চ পূর্ণতার স্তরে পৌঁছান তাদের শেষ অবস্থায়, শুরুতে না। এই মর্যাদা তারা অর্জন করেন, মহান আল্লাহর আদেশকৃত ভালো কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে। আর এই ভালো কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম, বরং সর্বোত্তম হল – তাওবা।

তাওবা করা হয় কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতা থেকে। আর এমন কোনো সিদ্দিক নেই; যিনি কুফর, পাপাচার বা অবাধ্যতা থেকে তাওবা করতে পারবেন না। তাওবা করলে তাওবাকারীর পূর্বের মর্যাদা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয় না। আর না এমন কোনো মানুষ কল্পনা করা সম্ভব, যার কিনা তাওবা করার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।

মারফু হাদিসে যেমনটা এসেছে, “প্রত্যেক আদম সন্তানই অন্যায়কারী। তাদের মধ্যে সর্বোত্তম হল, যারা তাওবা করে”।[2]

সাহিহ বুখারিতে তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে, “হে লোকসকল, তোমরা তোমাদের রবের কাছে তাওবা করো। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, আমি আল্লাহর কাছে দিনে সত্তরের বেশিবার ক্ষমা চাই ও তাওবা করি”।[3]

সাহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “আমার অন্তর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, আর আমি আল্লাহর কাছে দিনে শতবার ক্ষমা প্রার্থনা করি”।[4]

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মাহকে যেমন সাধারণভাবে তাওবার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি এও জানিয়েছেন যে তিনি নিজেও আল্লাহর কাছে দিনে সত্তর বারের বেশি ক্ষমাপ্রার্থনা ও তাওবা করেন। 

বরং বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিস:

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي خَطِيئَتِي وَجَهْلِي وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي جِدِّي وَهَزْلِي وَخَطَئِي وَعَمْدِي وَكُلُّ ذَلِكَ عِنْدِي اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، أَنْتَ إلَهِي لا إله إلا أنت

“হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করে দিন, আমার অপরাধ, আমার অজ্ঞতা, আমার কাজের সকল বাড়াবাড়ি এবং সেসব বিষয় যা আপনি আমার চেয়েও বেশি জানেন। হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করে দিন, যা আমি করেছি গাম্ভীর্য্য ও ঠাট্টাচ্ছলে, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃতভাবে। আর এসবই আমার মাঝে বিদ্যমান। হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমা করে দিন, যা আমি করেছি আগে ও পরে, গোপনে ও প্রকাশ্যে। আপনিই আমার উপাস্য আর আপনি ছাড়া কোনো প্রকৃত উপাস্য নেই”।[5]

এই দুআতে উল্লেখিত নবিজির স্বীকারোক্তি তো সিদ্দিককে শেখান দুআর চেয়েও গুরুতর। অথচ সিদ্দিকদের পক্ষ থেকে যে সবধরনের পাপ ঘটতে পারে, এ ব্যাপারে ইমামগণ একমত। হতে পারে কোনো ব্যক্তি পূর্বে কাফির ছিল, পরে কুফর থেকে তাওবা করে সে একসময় সিদ্দিকে পরিণত হয়েছে। অথবা হয়ত সে অবাধ্য, পাপাচারী ছিল এবং পরবর্তীতে পাপাচার ও অবাধ্যতা থেকে তাওবা করে সিদ্দিকে পরিণত হয়েছে। মতবিরোধ আছে শুধুমাত্র নবিদের ক্ষেত্রে।

দ্বীনের মহান ইমাম ও মাশাইখদের মত অনুযায়ী, ওলি ও সিদ্দিক হওয়ার জন্য ভুল বা ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে নিষ্পাপ হওয়া শর্ত নয়। 

বরং নবিজির পর এই উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আস-সিদ্দিক আল-আকবার আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর বলেছিলেন, “হে লোকসকল, তোমাদের কাছে শক্তিমান ব্যক্তি আমার কাছে দূর্বল বলে গণ্য, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছ থেকে হক আদায় না করে নিচ্ছি। আর তোমাদের কাছে দূর্বল ব্যক্তি আমার কাছে শক্তিশালী হিসেবে গণ্য, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার প্রাপ্য হক আদায় করিয়ে না দিচ্ছি। আমি যেসব ব্যাপারে আল্লাহর আনুগত্য করছি, সেক্ষেত্রে আমার আনুগত্য করো। আর আমি যদি আল্লাহর অবাধ্য হই, তখন কোনো আনুগত্য নেই”।

সাহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন একটি স্বপ্নের কথা উল্লেখ করলে আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে তা ব্যাখ্যা করতে দিন। এরপর তিনি এর ব্যাখ্যা শেষে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি ঠিক বলেছি নাকি ভুল করেছি? তিনি বললেন: “কিছুটা ঠিক বলেছ আর কিছু ভুল করেছ”।[6]

এছাড়াও সিদ্দিক ‘কালালাহ’ সংক্রান্ত ফতোয়ায় বলেছিলেন: “আমি এব্যাপারে আমার নিজের মত দিচ্ছি। সঠিক হলে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে তা আমার নিজের ও শয়তানের পক্ষ থেকে”। 

সুতরাং তাওবাকারীর মর্যাদা তাওবার পূর্বের অবস্থানের চেয়ে শুধু বৃদ্ধিই পায়। এবিষয়টি স্পষ্ট হলে সিদ্দিক হোক বা অন্য কেউ, তাওবা-ইসতিগফারের পূর্বে তাদের পক্ষ থেকে কী ঘটেছিল এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে না। আর যদি কেউ তা করেও, সে হয় জাহিল আর না হয় যালিম। বরং কোনো ব্যক্তি যতকিছুই করুক, যদি সে তাওবা করে থাকে, তার বিষয়টি সেখানেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এবং তার মর্যাদা উন্নীত হয়েছে। এই ব্যাখ্যার পর, সিদ্দিকের কাছ থেকে কিছু ঘটার ব্যাপারটি আর ততটা গুরুতর মনে হবে না। যদিও এই উম্মাহর সিদ্দিক ছিলেন ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ও পরে পাপ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা ব্যক্তিদের একজন। এমনকি তিনি জাহিলি যুগেও মদ পান করেননি এবং লোকেদের নিকট সত্যবাদি, আমানতদার ও সুমহান চরিত্রের অধিকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তিনি পাপ থেকে দূরতম ব্যক্তিদের একজন হলেও, আমার উদ্দেশ্য ছিল এই প্রশ্ন উদ্রেক হওয়ার মূল ছিদ্রটাই বন্ধ করে দেয়া।   

সুতরাং মোদ্দা কথা হল, প্রত্যেক আদম সন্তানই নিজের উপর করা যুলমের স্বীকারোক্তি প্রদান এবং তাওবা করার মুখাপেক্ষী। আর তা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন এমন একজন, যিনি ছিলেন আবু বকরের চেয়েও উত্তম।

দ্বিতীয় বিষয় হল, অবিচারের বিভিন্ন রূপ ও স্তর রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজস্ব স্তর ও মর্যাদা অনুযায়ী নিজের উপর অবিচার করে থাকে। এমতাবস্থায় প্রত্যেক সিদ্দিক কী কী কাজ করেছেন, তার তালিকা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহর সাথে বান্দার অনেক বিষয় আল্লাহ ও বান্দার মাঝেই গোপন থাকে। আমরা শুধুমাত্র ততটুকুই জানতে পারি, যা কুরআন ও সুন্নায় এসেছে। আর আমাদের জন্য এর বেশি জানার কোনো প্রয়োজনও নেই। কারণ এসব বিষয়ে কাউকে অনুসরণ করার আদেশ দেয়া হয়নি, অনুসরণ করতে হবে শুধুমাত্র ভালো কাজের ক্ষেত্রে।

মানুষ যত পাপই করুক, কখনো আল্লাহর দয়া থেকে আশাহত হওয়া যাবে না। মহিয়ান আল্লাহ বলেছেন: “হে আমার বান্দা যারা নিজেদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ, আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন”। [যুমার: ৫৩]

আর আমরা জানি, আল্লাহর উপর ভরসা করা বান্দার জন্য ফরজ। তাঁর জন্য ইবাদাতকে একনিষ্ঠ করা ফরজ। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসা ফরজ। আল্লাহর আদেশ পালন ও বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করা ফরজ। মানুষকে ভয় না করে শুধুমাত্র এক আল্লাহকে ভয় করা ফরজ। শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই আশা করা ফরজ। এধরনের আরো বহু প্রকাশ্য ও অভ্যন্তরীণ আমল রয়েছে, যেসব বিষয়ে অধিকাংশ মানুষেরই কোনো না কোনো কমতি আছে। আর এধরনের যে কোনো একটি ইবাদাত নিয়েই যদি সিদ্দিকদের কেউ গভীরভাবে চিন্তা করেন, তিনি নিজেকে অবিচারকারী রূপে দেখতে পান।

এর সাথে যোগ করুন, সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ; পরিবার, প্রতিবেশী ও বিশ্বাসীদের অধিকার রক্ষা, প্রত্যেকটি আদেশ যথাযথরূপে সম্পাদন করার মত অগণিত আরো অনেক বিষয়।

ইবনু আবি মুলাইকা থেকে বুখারি বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: “আমি ত্রিশজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছি। তারা প্রত্যেকেই নিজের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন”।

সাহিহ হাদিসে এসেছে, হানযালা যখন নিজের ব্যাপারে বলেছিলেন: “হানযালা মুনাফিক হয়ে গেছে”। আবু বকর তা শুনে বলেছিলেন: “আমরাও”।[7]

তারা নিজেদের জ্ঞান ও ইমানের পূর্ণতার কারণে নিজেদের উপর নিফাকের ভয় করতেন।

আর একারণেই আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদসহ সালাফদের অনেকে নিজেদের ইমানের ব্যাপারে এভাবে বলতেন যে, “আমি মু’মিন ইন শা আল্লাহ”।

আর আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।


উৎস: শারহু হাদিস আবি বাকর আস-সিদ্দিক আল্লাহুমা ইন্নি যালামতু নাফসি যুলমান কাসিরান, শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন আবদিল হালিম ইবন তাইমিয়্যা; তাহকিক ও তাখরিজ: ইবনু আবদিল মাকসুদ

ছবির সূত্র: অনির্দিষ্ট।

ফুটনোট:

[1] বুখারি, মুসলিম ও অন্যান্য।

[2] তিরমিজি: ২৪৯৯; ইবনু মাজাহ: ৪২৫১

[3] বুখারি: ৬৩০৭

[4] মুসলিম: ২৭০২

[5] তিরমিজি: ৩৪২৩; বুখারি ও মুসলিমের ভাষ্যে শেষের লাইনটি নেই।

[6] বুখারি: ৭০৪৬; মুসলিম: ২২৬৯

[7] মুসলিম: ২৭৫০

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *