মানসিক অসুস্থতার কলঙ্কমোচন

– ড. সুহাইল লাহের

মানসিক অসুস্থতা একটি ভয়ানক বাস্তবতা যা আমাদের অনেক কমিউনিটিতে ভুলভাবে কলঙ্কিত করে রাখা হয়েছে। মানুষ হয় এটাকে উপেক্ষা করে, অথবা এর জন্যে লজ্জিত হয়। নিজেদের ঈমানী দুর্বলতাকে, শয়তান ও কালো জাদুকে এর জন্যে দোষারোপ করে। মেডিকেল চিকিৎসা এড়িয়ে চলে।

আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন ও একজন ইমাম হিসেবে মানুষের সাথে মেলামেশার সুবাদে অনেক মানসিক-অসুস্থতার রোগীর মুখোমুখি হয়েছি। এই বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা পরিসরে সাইকিয়াট্রিস্টদের সাথে আলোচনা করেছি এবং মানসিক অসুস্থতার উপর বিভিন্ন ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছি। ইসলামী আকীদা ও ফিকহী ট্র্যাডিশনের ব্যাপারেও আমার জানাশোনা আছে এবং এর উপর বিশ্বস্ত থাকার ব্যপারে আমি সচেষ্ট। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি দুটি ছোট পয়েন্ট তুলে ধরতে চাই:

১. ভাল ও প্র্যাক্টিসিং মুসলিম হওয়া মানসিক অসুস্থতা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দেয় না।

আল্লাহর উপর আপনার ঈমান মানসিক অসুস্থতা সামলাতে সাহায্য করবে, কিন্তু পুরোপুরি সুরক্ষা দেবে না, যেমন ঈমান আপনাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা, হৃদরোগ, ক্যান্সার বা হাড়ভাঙ্গা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দেয় না। মানসিক অসুস্থতাও এক ধরনের অসুস্থতা এবং সর্বোপরি মস্তিষ্ক দেহের অংশ। হানাফী ফকিহ ইবনুল হুমাম (রাহিমাহুল্লাহ) পাগলামিকে “স্বর্গীয় আক্রমণعارض) السماء)” হিসেবে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেও একই জিনিস খাটে। সুতরাং আপনি যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হন, এটা দুর্বল ঈমান বা আধ্যাত্মিকতার ঘাটতির কারণে হয়েছে এমন ভাবার কারণ নেই। সামাজিক ও চিকিৎসাগত সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। মুসলিম হিসেবে ঔষধ নেয়ার মাধ্যমে আপনি কোন ধর্মীয় বিধি-বিধান লঙ্ঘন করছেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা কর। কেননা মহান আল্লাহ এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার সাথে প্রতিষেধকেরও ব্যবস্থা করেননি।” (সহীহ ইবন হিব্বান)

২. কিন্তু জিন ও যাদুর ব্যাপারে কী হবে?

প্রাক-আধুনিক মুসলিম ফকিহগণ পাগলামিকে এমন ব্যাধি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যা মানুষের কথা ও কর্মকে যৌক্তিক হতে বাধা দেয়। এটা স্থায়ী অবস্থা হতে পারে, আবার মধ্যবর্তী বিরতিও থাকতে পারে। অধিকাংশ সুন্নী আলিমরা জিনে ধরা ও কালো জাদুর বাস্তবতায় বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সব মানসিক অসুস্থতা এগুলোর দ্বারা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল হানাফী ফকিহ আমির বাদশা (রাহিমাহুল্লাহ) “সামর্থ্যের আক্রমণ” নিয়ে আলোচনার সময় তুলে ধরেছেন যে পাগলামি দুই প্রকারের হয়: এক প্রকার মস্তিষ্কে অসামঞ্জস্যের কারণে হয় যা (ঔষধের দ্বারা) চিকিৎসাযোগ্য। অন্য প্রকার জিনের দ্বারা হয় যার বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক প্রতিকার (কুরআন তিলাওয়াত) সাহায্যকারী হতে পারে। আমি আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলব, কেউ যদি জিন বা জাদুর সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে নিশ্চিতও হয়, সে আধ্যাত্মিক প্রতিকার যেমন কুরআনের রুকইয়া নেয়ার পাশাপাশি উপসর্গের জন্য মেডিকেল চিকিৎসা নিতে পারে এবং নেওয়া উচিত।

আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন এবং আমাদের জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার শক্তি দান করুন।


লেখক পরিচিতি: ড. সুহেইল লাহের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া তিনি আকিদা, ফিকহ, হাদিস প্রভৃতিতে বিভিন্ন আলিমদের থেকে ইজাজাহপ্রাপ্ত। বর্তমানে ফাওয়াকিহ ইন্সটিটিউটের ডিন তিনি।

মূল লেখা: Destigmatizing Mental Illness – Suheil Laher’s Islam Website

-মূল লেখা: ড. সুহেইল লাহের

মানসিক অসুস্থতা একটি ভয়ানক বাস্তবতা যা আমাদের অনেক কমিউনিটিতে ভুলভাবে কলঙ্কিত করে রাখা হয়েছে। মানুষ হয় এটাকে উপেক্ষা করে, অথবা এর জন্যে লজ্জিত হয়। নিজেদের ঈমানী দুর্বলতাকে, শয়তান ও কালো জাদুকে এর জন্যে দোষারোপ করে। মেডিকেল চিকিৎসা এড়িয়ে চলে।

আমি আমার ব্যক্তিগত জীবন ও একজন ইমাম হিসেবে মানুষের সাথে মেলামেশার সুবাদে অনেক মানসিক-অসুস্থতার রোগীর মুখোমুখি হয়েছি। এই বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা পরিসরে সাইকিয়াট্রিস্টদের সাথে আলোচনা করেছি এবং মানসিক অসুস্থতার উপর বিভিন্ন ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছি। ইসলামী আকীদা ও ফিকহী ট্র্যাডিশনের ব্যাপারেও আমার জানাশোনা আছে এবং এর উপর বিশ্বস্ত থাকার ব্যপারে আমি সচেষ্ট। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি দুটি ছোট পয়েন্ট তুলে ধরতে চাই:

১. ভাল ও প্র্যাক্টিসিং মুসলিম হওয়া মানসিক অসুস্থতা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দেয় না।

আল্লাহর উপর আপনার ঈমান মানসিক অসুস্থতা সামলাতে সাহায্য করবে, কিন্তু পুরোপুরি সুরক্ষা দেবে না, যেমন ঈমান আপনাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা, হৃদরোগ, ক্যান্সার বা হাড়ভাঙ্গা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা দেয় না। মানসিক অসুস্থতাও এক ধরনের অসুস্থতা এবং সর্বোপরি মস্তিষ্ক দেহের অংশ। হানাফী ফকিহ ইবনুল হুমাম (রাহিমাহুল্লাহ) পাগলামিকে “স্বর্গীয় আক্রমণعارض) السماء)” হিসেবে শ্রেণীবিভাগ করেছেন। অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রেও একই জিনিস খাটে। সুতরাং আপনি যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হন, এটা দুর্বল ঈমান বা আধ্যাত্মিকতার ঘাটতির কারণে হয়েছে এমন ভাবার কারণ নেই। সামাজিক ও চিকিৎসাগত সাহায্য নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয় বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। মুসলিম হিসেবে ঔষধ নেয়ার মাধ্যমে আপনি কোন ধর্মীয় বিধি-বিধান লঙ্ঘন করছেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা কর। কেননা মহান আল্লাহ এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার সাথে প্রতিষেধকেরও ব্যবস্থা করেননি।” (সহীহ ইবন হিব্বান)

২. কিন্তু জিন ও যাদুর ব্যাপারে কী হবে?

প্রাক-আধুনিক মুসলিম ফকিহগণ পাগলামিকে এমন ব্যাধি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যা মানুষের কথা ও কর্মকে যৌক্তিক হতে বাধা দেয়। এটা স্থায়ী অবস্থা হতে পারে, আবার মধ্যবর্তী বিরতিও থাকতে পারে। অধিকাংশ সুন্নী আলিমরা জিনে ধরা ও কালো জাদুর বাস্তবতায় বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সব মানসিক অসুস্থতা এগুলোর দ্বারা হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল হানাফী ফকিহ আমির বাদশা (রাহিমাহুল্লাহ) “সামর্থ্যের আক্রমণ” নিয়ে আলোচনার সময় তুলে ধরেছেন যে পাগলামি দুই প্রকারের হয়: এক প্রকার মস্তিষ্কে অসামঞ্জস্যের কারণে হয় যা (ঔষধের দ্বারা) চিকিৎসাযোগ্য। অন্য প্রকার জিনের দ্বারা হয় যার বিরুদ্ধে আধ্যাত্মিক প্রতিকার (কুরআন তিলাওয়াত) সাহায্যকারী হতে পারে। আমি আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলব, কেউ যদি জিন বা জাদুর সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে নিশ্চিতও হয়, সে আধ্যাত্মিক প্রতিকার যেমন কুরআনের রুকইয়া নেয়ার পাশাপাশি উপসর্গের জন্য মেডিকেল চিকিৎসা নিতে পারে এবং নেওয়া উচিত।

আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন এবং আমাদের জীবনের বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার শক্তি দান করুন।


লেখক পরিচিতি: ড. সুহেইল লাহের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া তিনি আকিদা, ফিকহ, হাদিস প্রভৃতিতে বিভিন্ন আলিমদের থেকে ইজাজাহপ্রাপ্ত। বর্তমানে ফাওয়াকিহ ইন্সটিটিউটের ডিন তিনি।

অনুবাদক- ওসমান হারুন সানি

মূল লেখা: Destigmatizing Mental Illness – Suheil Laher’s Islam Website

Photo: Internet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *