বিদআতের বিস্তারিত পাঠ

শায়খ ইসমাইল হাকামালি

(লেখাটি হাম্বলি ফিকহ অনুসারে। অন্যান্য মাযহাবেও ধারণা কাছাকাছি, তবে কিছু আলেম আরেকটু কঠোর, কেউ কেউ আরেকটু শিথিলতা বজায় রাখেন।)

“যদি বিদ’আত বলতে ما احدث وله اصل في الشريعة يدل ٰٰعليه (নতুন কিছু যার দলিলবিশিষ্ট আসল/ভিত্তি শরিয়তে আছে) অথবা ما عمل علي غير مثال سابق (পূর্বের দৃষ্টান্তের বাইরে আমল করা) বুঝানো হয়, তাহলে এটা একেবারে বিদ’আতের আক্ষরিক অর্থ। তাই যখন আমরা দেখতে পাই আলিমরা বিদ’আতকে ৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করছেন, যেমনঃ ওয়াজিব, মুস্তাহাব, মুবাহ, মাকরুহ, হারাম – তাঁরা এগুলো বিদ’আতের আক্ষরিক অর্থের ভিত্তিতে বলছেন।

নিচে বিদ’আতের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

(শারিহুল মাযহাব) ইমাম বুহুতি আল-হাম্বলি (র) আল-কাশশাফে বলেছেন,

(وَلَا بَأْسَ بِالْأَكْلِ بِالْمِلْعَقَةِ)

وَإِنْ كَانَ بِدْعَةً لِأَنَّهَا تَعْتَرِيهَا الْأَحْكَامُ الْخَمْسَةُ

“চামচ দিয়ে খেতে সমস্যা নেই, যদিও এটা বিদ’আত, কারণ বিদ’আত ৫ ধরণের হুকুম নেয়।”আল-কাশশাফ , ইমাম বুহুতি

তাই আমরা এখানে বিদ’আতের জায়েজ হবার উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি।

বিদ’আত মাকরুহ হওয়ার উদাহরণ হচ্ছে সালাতে নিয়ত এমন জোরে পড়া, যা অন্য কেউ শুনতে পায়। আবার আস্তে আস্তে নিয়ত উচ্চারণ করা মুস্তাহাব। এখানে আস্তে আস্তে উচ্চারণ করা বিদ’আত, কারণ এই ব্যাপারে আমাদের নির্দিষ্টভাবে নস নেই, তবে হজে নিয়ত উচ্চারণের মধ্যে দিয়ে আমরা এর ভিত্তি দেখতে পাই।

ইমাম বুহুতি শারহুল মুন্তাহায় বলেছেন,

(وَ) يُسَنُّ (نُطْقٌ بِهَا) أَيْ النِّيَّةِ (سِرًّا) لِيُوَافِقَ لِسَانُهُ قَلْبَهُ

“নিয়ত আস্তে উচ্চারণ করা মুস্তাহাব যাতে জিহবা আর অন্তর মিলে যায়।”শারহুল মুনতাহা আল-ইরাদাতইমাম বুহুতি

তাই যখন আমরা সায়্যিদুনা উমর (রা) বক্তব্য পড়ি, “نعمت هذه البدعة ” এটা এই প্রকারের মধ্যে পরে।

তাই যে জিনিসের ‘আসল’ বা ‘ভিত্তি’ আছে (কাইদা বা মূলনীতি/সাধারণ শারই’ ভাষ্য বা নুসুস) যা কোনো নতুন হুকুম বের করতে ব্যবহার করা যাবে, অথবা এটা ফার’ [শাখাগত মাসআলা] যার উপর কিয়াস করে নতুন হুকুমের সাথে শরিয়ার সংযোগ স্থাপন করা যাবে – তাহলে এটা বিদ’আতের আক্ষরিক/শাব্দিক অর্থের মধ্যে পড়ে। এই বিদ’আত প্রশংসার যোগ্য হতে পারে, যেমন উমর (রা) এর উদ্ভাবিত বিশ রাকাআত তারাবির সালাত, উসমান (রা) উদ্ভাবিত জুমুয়ার দুই আযান, অথবা বিলাল (রা) উদ্ভাবিত প্রত্যেক ওযুর পর দুই রাকাআত সালাত। বিশেষ করে, বিলাল (রা) এর হাদিসটি কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ এটা রাসুলুল্লাহ (সা) বেঁচে থাকা অবস্থায় করা হয়েছিল, তবুও রাসুলুল্লাহ (সা) তাঁর ইস্তিদলাল করার পদ্ধতিকে তিরস্কার করেন নি। যদি এই পদ্ধতি ভুল হত, তাহলে নিশ্চয়ই তিনি তাকে ঠিক করে দিতেন। তাই রাসুলুল্লাহ (সা) বিলাল (রা)-এর কাজ এবং পদ্ধতিকে সমর্থন করেছিলেন এবং বৈধতা দিয়েছিলেন।

শাব্দিক অর্থের বিদ’আত খারাপ এবং নিন্দনীয় হতে পারে, উদাহরণস্বরূপ, ইবাদাতের সাথে মাকরুহ কিছু যুক্ত করা – যেমনঃ জোরে নিয়ত উচ্চারণ করা যাতে অন্যরাও শুনতে পায়, অথবা যিকরের সাথে ফ্রি-মিক্সিং, সঙ্গিত, নাচ যুক্ত করা – যেগুলো নিঃসন্দেহে হারাম।

আল-বা’লি আল-মুতলিতে বলেছেনঃ

والبدعة: بدعتان، بدعة هدى، وبدعة ضلالة. والبدعة: منقسمة بانقسام أحكام التكليف الخمسة

“বিদ’আত দুই ধরণের, হিদায়াতের বিদ’আত এবং ভ্রান্তির বিদ’আত। বিদ’আতকে ৫টি আহকাম আত-তাকলিফিয়া অনুসারে ভাগ করা হয়।”ইমাম আল বা’লি [র]

আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ করা আমার মতে গুরুত্বপূর্ণ, (সেটা হচ্ছে এগুলো শুধু বিদ’আতের শাব্দিক অর্থের ক্ষেত্রে)।

কিন্তু যদি বিদ’আত দ্বারা আমরা ‘ما لا اصلا له في الشريعة يدل ٰٰٰعليه، ُ’ অর্থাৎ এই নির্দিষ্ট বিদ’আতের জন্যে কোনো [দলিলবিশিষ্ট] আসল/ভিত্তি নেই, তাইলে এটা বিদ’আতের শারই’ সংজ্ঞা এবং এই ধরণের সকল বিদ’আত খারাপ এবং নিন্দণীয়।

মানে হচ্ছে, এমন কোনো সাধারণ কা’ইদা নেই যার অধীনে হুকুম বা মাস’আলাকে রাখা যাবে, অথবা কোনো ফার’ নেই যার উপর কিয়াস করা যাবে, অথবা একে সমর্থন করার মত নুসুস নেই, তাহলে এটা বিদ’আতের শারই’ সংজ্ঞা, এবং এগুলো সব নিন্দনীয়, মাকরুহ অথবা হারাম।

এছাড়া, হাম্বলি উলামাদের ভাষার সাধারণ ধরণ হচ্ছে শুধু নিন্দনীয় বিষয়গুলোকেই বিদ’আত ডাকা। ফিক্বহের কিতাবগুলো অধ্যয়ন করলে পরিস্কার হয়ে উঠে যে, কিছু কিছু বিষয় আক্ষরিকভাবে বিদ’আত হলেও সেগুলোর হুকুম “মুস্তাহাব”, কিন্তু উলামারা এগুলোকে “ভালো বিদ’আত” ডাকতে আগ্রহী নন। বরং “বিদ’আত” (পরিভাষাটি) মাকরুহ বা হারামের জন্যে (অর্থাৎ নিন্দনীয় বিষয়ের জন্যে) আলাদা করে রাখা।

আল্লাহ্‌ই ভালো জানেন। “

সংযুক্তি: শারই’ বিদ’আতের ফলাফলের মাত্রার উপর নির্ভর করে ফিকহি হুকুম মাকরুহ অথবা হারাম হতে পারে। তবে উভয় প্রকারের বিদ’আতের ক্ষেত্রেই, শরিয়তে [শারই’] বিদ’আত উদ্ভাবন করার ধারণা, অথবা  বিদ’আতের দিকে ডাকা হারাম। আর শরিয়ত অসম্পূর্ণ এবং তাই নতুন কিছু যোগ করা প্রয়োজন এমন মনে করা কুফর।

অনুবাদ: ফারশিদ খান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *