ফিকহি ইখতিলাফ: উসুলের আলোকে সংঘাত নিরসন

মুফতি ত্বহা কারান (রহিমাহুল্লাহ)

পূর্বকথা: শাইখ কিছুদিন আগেই কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। তিনি সাউথ আফ্রিকায় ইলমি পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন ফকিহ ও অনেক জ্ঞানের অধিকারী আলেম ছিলেন। শাফেয়ি হলেও তিনি পাশাপাশি দারুল উলুম দেওবন্দে পড়াশোনা করেন। শাইখের মৃত্যুর পর এই উপকারী বক্তব্যের অংশ চোখে পড়ার ফলে সবার ফায়দার জন্যে অনুবাদ করে ফেলি। অডিও বক্তব্য বিধায় এখানে মূলত ভাবানুবাদ এবং অনুলিখন করা হয়েছে। আল্লাহ্‌ শাইখকে জান্নাত দান করুন, আমীন।

আমার মনে পড়ে, আমার নিজের উস্তাদ মাওলানা নিয়ামতউল্লাহ আজামি খিলাফের কোনো মাস’আলা আসলেই বলতেন, “আমাদের ইমাম শাফেয়ি”, “আমাদের ইমাম মালিক”। আবার তুমি এমন একদলকে পাবে যারা বলবে, “তোমরা শাফেয়ীরা যদি মনে করো মনি (বীর্য) তাহির, তাহলে কেন তোমরা খাও না!” নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক।

আমি মনে করি, ইখতিলাফের মাস’আলাগুলোর সাথে এমন আচরণ আমাদের ভবিষ্যতের মাসলাহার (interest) সাথে যায় না।

কারও সাথে যদি লড়তেই হয়, তবে সেটা বিদআতিদের সাথে।

কারও সাথে যদি লড়তেই হয়, সেটা যারা শরিয়াতকে ধ্বংস বা পরিবর্তন করতে চায় তাদের সাথে।

কারও সাথে যদি লড়তেই হয়, তাহলে সেটা যারা মাসলাহাকে সম্পূর্ণরুপে নুসুসের (কুর’আন সুন্নাহর ভাষ্য) উপর স্থান দিতে চায়, তাদের সাথে।

আগামীর জন্যে আমাদের এগুলোতে ইসলামকে ডিফেন্ড করতে প্রস্তুত হতে হবে। আর মাযহাবগুলোর মধ্যে ইখতিলাফি মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে আমি বিশ্বাস করি, কেউ যদি এই ইখতিলাফগুলোকে স্বীয় মাযহাবের উসুলের আলোকে দেখে, তাহলে খুব সহজ সমাধান পাওয়া সম্ভব। সহজ সমাধান হচ্ছে, এই মাযহাবের এই নির্দিষ্ট উসুলি পদ্ধতি রয়েছে, তাঁরা এই উপসংহারে পৌঁছেছে, অন্য মাযহাবের ভিন্ন উসুলি পদ্ধতি রয়েছে, ফলে তাঁরা অন্য মত পোষণ করেছে।

একবার আমি তিরমিযির উপর দরস দিচ্ছিলাম, তখন এমন ধরণের কথা বলেছিলাম। তখন এক ছাত্র জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু মাওলানা! আমরা এটার (এই মতের) বিপরীতে এভাবে যুক্তি দিতে পারি”। আমি বললামঃ না, আমি এই যুক্তি জানি। এর বিপরীত যুক্তি জানি। এই বিপরীত যুক্তির বিপরীত যুক্তিও জানি। কিন্তু এগুলো আমাদের উদ্দেশ্য না। আমাদের উদ্দেশ্য তর্ক না। আমাদের উদ্দেশ্য প্রত্যেক মাযহাবকে রাজিহ বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রমাণ করা নয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মাযহাবগুলোর মধ্যে এমনভাবে সম্প্রীতি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করা, যাতে তাঁরা সবাই একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাইরের শক্তি মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়।

আমার একটা কঠিন সময় ছিল, যখন আমি দারুল উলুম দেওবন্দে ছাত্র ছিলাম। সমস্যা হল পরীক্ষা নিয়ে, শিক্ষক তো আমার থেকে ক্লাসে পড়ানো অনুসারে উত্তর আশা করবেন। কিন্তু আমি সেটা ঠিক মনে করি না, ফলে আমার নাম্বার কমে যাবে। আর তিনি যা বলেছেন সেটা যদি লিখি, তাহলে আমি নিজের বিশ্বাস এবং আমল নিয়ে সমস্যায় পড়ে যাব। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এভাবে লিখতেঃ “আমার মাযহাবে এই উসুল, তাই তাঁরা এখানে সঠিক, তাদের মাযহাবে এই উসুল, তাই তাড়াও সঠিক।” আমার উস্তাদ এটাকে খুব পছন্দ করলেন এবং পূর্ণ নাম্বার দিলেন।

আমি মনে করি এই ব্যাপারটাকে আরও বড় পরিসরে নেওয়া উচিৎ। মাযহাবগুলোর অভ্যন্তরীণ খিলাফের ব্যাপারে এই পুরো দৃষ্টিভঙ্গিকে কোনোভাবেই যুদ্ধক্ষেত্র বানানো যাবে না। কারণ যখন আমরা নিজেদের ভেতর যুদ্ধ করছি, আমরা নিজেদের ধ্বংস করছি। আমার হাসান ইবনে আবি তালিব আর মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের সময়ের কথা মনে পড়ে, তখন তাঁরা একে অপরের বিরুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছিলেন। হাসান লক্ষ্য করলেন, মুসলিমদের দুটো বাহিনী পরস্পরের প্রতি অগ্রসর হচ্ছে, অন্যদিকে রোমানরা বর্ডারে অপেক্ষা করছে। যদি মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে, তখন রোমানরা আক্রমণ করবে এবং প্রতিরক্ষা করার মত বাহিনী অবশিষ্ট থাকবে না। এরপর তিনি হিজরি ৪০ সনে মুয়াবিয়া (রা) এর প্রতি বাইয়াত দেবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন, ফলস্বরূপ মুসলিমদের মধ্যে বড় জামাআহ তৈরি হল। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন,

إِنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ عَظِيمَتَيْنِ
আমার এই ছেলে (হাসান) হচ্ছে একজন নেতা। আল্লাহ্‌ তাঁর মাধ্যমে মুসলিমদের দুটো বড় জামাআতের মধ্যে সমঝোতা করে দিক।(শাইখ সামান্য ভিন্ন শব্দ বর্ণনা করেছেন। উপরের ইবারত সুনানে নাসাঈ গ্রন্থে এসেছে (১৪২১), হাদিসটি ভিন্ন শব্দে বুখারি, আবু দাউদে এসেছে)

এই দিক থেকে আমি মনে করি, আমরা কমন-গ্রাউন্ড খুঁজে পেতে পারি। আর আমি বিশ্বাস করি এই কমন-গ্রাউন্ড উসুলের জায়গায় বিদ্যমান। যদি আমরা উসুলের আলোকে ইখতিলাফকে বুঝতে পারি, তবে আমাদের সেদিকেই যাওয়া উচিৎ।

অনুবাদ- ফারশিদ খান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *