আর-রিজালু কাওওয়ামুনা আলা’ন নিসা

মূল লেখক: মুফতি মুহাম্মাদ তাকি উসমানি (হাফিযাহুল্লাহ)

মহান আল্লাহ কুর’আনে বলেছেন,

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ

“পুরুষরা নারীদের উপর কাওওয়াম (দায়িত্বপ্রাপ্ত/নেতৃত্বপ্রদানকারী), যাতে আল্লাহ তাদের কাউকে অপরের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।” [সুরা নিসাঃ ৩৪]

আজ আমরা ফেমিনিজিম এবং নারী-পুরুষের সমতা সংক্রান্ত প্রচুর প্রোপাগান্ডা দেখতে পাই। এই পরিবেশে মুসলিমরা “পুরুষরা নেতৃত্ব দেয় আর নারীরা অনুসরণ করে” বলতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে। কারণ একটা ধারণা প্রচলিত আছে— এতে পুরুষরা একধাপ সুবিধা ভোগ করে, আর নারীদেরকে পরানো হয় পরাধীনতার শেকল, করা হয় হেয় ও অসম্মান। কিন্তু এ জীবনের বাস্তবতা হলো, নারী এবং পুরুষ গাড়ির দুই চাকার মত। উভয়কে একসঙ্গে জীবন পাড়ি দিতে হবে। আর একসঙ্গে জীবন পাড়ি দেবার জন্যে জরুরি বিষয় হলো, একজনকে দায়িত্ব প্রদান করা। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

عن أبي سعيد الخدري، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: «إذا خرج ثلاثة في سفر فليؤمروا أحدهم»

আবু সাইদ আল-খুদরি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, “তিনজন কোনো সফরে বের হলে যাতে একজনকে আমির নিযুক্ত করে নেয়।” (তিরমিযি)

যদি আমির বা নেতা না থাকে, তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। রাসুলুল্লাহর (সা) নির্দেশ শুধুমাত্র বড় সফরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না, বরং ছোট সফরের ক্ষেত্রেও। তাহলে, যদি একটি ছোট সফরেই আমিরের প্রয়োজন হয়, তবে জীবনব্যপী যাত্রায় কেনো আমিরের প্রয়োজন হবে না?

এখন তাহলে দুটো পথ খোলা— হয় পুরুষকে এই দায়িত্ব নিতে হবে, নতুবা নারীকে। তৃতীয় কোনো কার্যকর পন্থা নেই। এই দায়িত্ব নেবার জন্যে প্রাকৃতিক সক্ষমতা, বৈশিষ্ট্য এবং শক্তির বিবেচনায় আনলে, এমনকি যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা দেখতে পাই, নারীর বিপরীতে পুরুষকে (সাধারণভাবে [১]) এই নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলি দেওয়া হয়েছে। তাই (সাধারণভাবে) শুধু পুরুষরা এই কাজের জন্যে উপযুক্ত। পুরুষ ও নারী উভয়ের সৃষ্টিকর্তা, যিনি উভয়কে এই যাত্রায় পাঠিয়েছেন— তিনিই ভালো জানেন কাকে নেতা বানানো উত্তম। যদি আমরা মহান আল্লাহর হুকুম মেনে চলি যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের ব্যাপারে আমাদের থেকেও বেশি জানেন, তাহলে আমরা সফলতা লাভ করবো। অন্যদিকে যদি আমরা তাঁর হুকুম না মানি, তবে আমাদের এ যাত্রা ভালোভাবে এগোবে না।

পুরুষের নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে আল্লাহ ‘রাজা’, ‘শাসক’, ‘মালিক’ কিংবা ‘প্রভু’ এর মত শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। বরং তিনি ‘কাওওয়াম’ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো কিছু কাজের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। পুরুষের ‘কাওওয়াম’ হবার অর্থ নারীর দাসী বা মালিকানাধীন হওয়া নয়। তাদের সম্পর্ক হলো নেতৃত্বপ্দানকারী এবং নেতৃত্বদানকৃতের সম্পর্ক। ইসলামে শাসক সে নয় যে [কেবল] তাঁর সিংহাসনে বসে শাসন করে। বরং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম শাসকের সংজ্ঞা দিয়েছেন,

سيد القوم خادمهم

কোনো জাতির নেতা হলো তাদের খাদেম। [২]

আজ আমরা যখন ‘নেতা’ শব্দটা শুনি, আমরা এমন এক শাসকের কথা কল্পনা করি যে নিজের অধীনস্থদের সাথে কথাও বলতে চায় না। সে মনে করে, তাদের সাথে কথা বলা তাঁর স্বীয় সম্মানের সাথে খাপ খায় না। কিন্তু কুরআন ও হাদিস অনুযায়ী, নেতা হলো এমন ব্যক্তি যে তাঁর অধীনস্থদের জন্যে কাজ বা সেবা করে এবং তাদের জন্যে জিনিসপাতি সহজ করে। নেতা এমন ব্যক্তি না, যে শুধু আদেশ দেয় এবং [অধীনস্থদের উপর] সেগুলো আরোপ করতে চায়।

মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৯৪৩] বলতেন, যারা পুরুষ ও নারীর মধ্যে সম্পর্কের অপব্যবহার করে এবং স্ত্রীদের চাকরানী বিবেচনা করে, তাদের উচিৎ আল্লাহ নাযিলকৃত আরেকটি আয়াত মাথায় রাখা-

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।” [৩০ঃ২১]

মাওলানা থানভি (র) বলতেন, পুরুষরা যেমন নারীর নেতা (নেতার ইসলামি সংজ্ঞানুযায়ী), পাশাপাশি এর মধ্যে একটি বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পুরুষ নেতা, কিন্তু পরস্পরের প্রতি সম্পর্কের দিক থেকে তাকে কাছের বন্ধুর মত হতে হবে। এই সম্পর্ক হলো দুই বন্ধুর সফরের মত, যেখানে এক বন্ধু অপর বন্ধুকে নেতা হিসেবে নেয়। [৩]


মূল লেখাটি লেখক মোহতারামের “اسلام اور دور حاضر کےشبہات اور مغالطے” থেকে নেয়া। অনুবাদ করা হয়েছে এখান থেকে।

ফুটনোট:

[১] কিছু মুফাসসির উল্লেখ করেছেন, এই প্রাধান্য সাধারণভাবে এক লিঙ্গের উপর আরেক লিঙ্গের, অর্থাৎ নারীদের উপর পুরুষদের। অর্থাৎ ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু নারী কিছু পুরুষ থেকে এই দায়িত্বে ভালো হতে পারে, সেটা এখানে নাকচ হয় না। [মারেফুল কুর’আন] আর বাস্তবিক প্রায়গিকতার দাবিতে ইসলামি হুকুম সাধারণ্যের ভিত্তিতে হয়।

[২] আল-মাকাসিদ আল-হাসানা, শামসুদ্দিন সাখাবি

[৩] পরিশেষে ইংরেজি অনুবাদক আরেকটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করেছেন-

“তাছাড়া এখানে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, কুরআনে সুরা নিসার ৩৪ নাম্বার আয়াতে বলা হয়নি, “আল্লাহ পুরুষদের নারীদের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন”, বরং এখানে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তাদের একজনকে অন্যের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।” দুটোর মধ্যে পার্থক্য পরিস্কার এবং তাৎপর্যবহ। এখানে ব্যবহৃত শব্দাবলির মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে- নারী ও পুরুষ একে অপরের অংশ (“তাদের একজন অন্যের উপর”), আর যদি তাদের একজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তার মানে অপরকে অসম্মান বা ক্ষতি করা নয়। এর মাধ্যমে কুর’আন আসলে পশ্চিমাদের নারী-পুরুষ সম্পর্কের ধারণায় গোঁড়ায় আঘাত করে যে- নারী পুরুষের সম্পর্ক পরস্পর প্রতিযোগিতার নয়, বরং পরিপুরকতার। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, “নারীরা পুরুষের সহদোরা (বোন)।” [দেখুন- মারেফুল কুরআনের উক্ত আয়াতের তাফসির]

অনুবাদ- ফারশিদ খান

Photo: Midjourney

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *