হাসপাতাল এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানঃ আমাদের ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকার

-ড. মুস্তাফা আস-সিবাঈ (র)

যে সকল নীতির উপর ভিত্তি করে আমাদের সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে, তার একটি হলো শারীরিক ও আত্মিক চাহিদাদ্বয়ের সমন্বয় । মানবীয় সুখ অনুভব এবং আত্মাকে উদ্দীপ্ত করার জন্য শরীর এবং তার চাহিদাগুলোর প্রতি যত্নশীল হওয়া আবশ্যক হিসেবে বিবেচিত । যেসকল হাদিস রাসুলুল্লাহর (সা) সভ্যতার এই ভিত্তিকে দাঁড়া করিয়েছে, তাঁর একটি হলো: {নিশ্চয়ই তোমার উপর তোমার শরীরের হক রয়েছে ।}[১]  

 ইসলামী ইবাদাতের-পদ্ধতি থেকে ঔষধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যের উপলব্ধি করা যায়, অর্থাৎ স্বাস্থ্য-সংরক্ষণ করা। আর তাই নামাজ, রোজা, হজ এবং এর শর্ত, রুকন এবং বিভিন্ন আমল মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য এবং এর শক্তি-ক্ষমতাকে সংরক্ষণ করে। আর যদি রোগ ও রোগ-বিস্তারের বিরুদ্ধে ইসলামের প্রচেষ্টা এবং রোগের নিরাময় অনুসন্ধানে ইসলামের আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে আপনি জানতে পারবেন আমাদের সভ্যতা চিকিৎসাক্ষেত্রে কি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং চিকিৎসা-প্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিক প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব আমাদের সভ্যতা থেকে কতটা উপকৃত হয়েছে, এমন চিকিৎসকের জন্ম দিয়েছে যাদের বিজ্ঞানে এবং বিশেষ করে চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদান আজও মানবতার গর্বের অংশীদার ।

আরবরা গোন্দিশাপুরের মেডিকেল-স্কুল সম্পর্কে জানত[২], যা খসরু কর্তৃক  খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাদের (আরবদের) কিছু চিকিৎসক সেখান থেকে পড়াশুনা করেছিলেন, যেমন- হারিস ইবনে কালাদাহ (রা.) । হারিস ইবনে কালাদাহ (রা.) নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে জীবিত ছিলেন । যখন কোনো সাহাবী (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়তেন,  তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) তার হারিসের নিকট চিকিৎসা নেওয়ার জন্য উপদেশ দিতেন । ওয়ালিদ ইবনে ‘আবদুল মালিকের যুগে ইসলামের প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা ছিল কেবল কুষ্ঠ-রোগীদের জন্য । সেখানে চিকিৎসক নিয়োগ করা হতো এবং ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হত। কুষ্ঠ-রোগীদের এবং অন্ধদের জন্যও কোয়ারেন্টাইন ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা ছিল । এরপরে ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা হওয়া শুরু হয় এবং সেগুলো বিমারসিতানাত নামে পরিচিত ছিল, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়  ‘অসুস্থদের জন্য ঘর’ ।

হাসপাতালগুলো ছিল দুই ধরনের; স্থায়ী এবং অস্থায়ী (ভ্রাম্যমাণ)[৩]। ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের ইসলামে সর্বপ্রথম পরিচিতি লাভ করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে, খন্দকের যুদ্ধে- সেখানে আহতদের জন্যে একটি তাঁবু ছিল। যখন সা’দ ইবনে মু’আয (রা.) তাঁর মধ্য বাহুর শিরায় আঘাত পান, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “তাকে রুফাইদা[৪] এর তাঁবুতে রাখ যাতে আমি ওকে কাছে থেকে দেখতে যেতে পারি ।” এটি ছিল ইসলামের প্রথম ভ্রাম্যমাণ সামরিক হাসপাতাল । পরবর্তীতে খলিফা ও সুলতানরা এটিকে এমনভাবে সম্প্রসারণ করেছেন, যার ফলে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালগুলোতে ক্রমে রোগীদের জন্য চিকিৎসা সামগ্রী, খাবার, পানীয়, পোশাক, ঔষধ – মোটকথা, যা যা  প্রয়োজন তার সমস্ত কিছুরই ব্যবস্থা থাকত। এই হাসপাতালগুলো শহর থেকে শহরে, মূলত যে জায়গাগুলোতে স্থায়ী হাসপাতাল ছিল না, সেসকল জায়গায় ভ্রমণ করত। মন্ত্রী ‘ঈসা ইবনে ‘আলী আল-জাররাহ সিনান ইবনে সাবিতকে (যিনি ছিলেন বাগদাদ এবং অন্যান্য বিভিন্ন হাসপাতালের দায়িত্বে ছিলেন) লিখেছিলেন, “আমার চিন্তা হয় ইরাকের গ্রামীণ মানুষগুলোকে নিয়ে। গ্রামগুলোর প্রতিটিতেই অসুস্থ মানুষ রয়েছে, তবুও গ্রাম্য এলাকাগুলোতে কোনো চিকিৎসক না থাকার কারণে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। তাই চিকিৎসকদের একটি প্রতিনিধি দল থাকা উচিত যারা বিভিন্ন ঔষধ ও সিরাপ নিয়ে গ্রামাঞ্চলে ঘুরতে থাকবে। প্রত্যেক এলাকায় মানুষকে চিকিৎসা-সেবা দেওয়া প্রয়োজন মোতাবেক অবস্থান করবে। তারপর তারা পরবর্তী এলাকায় গমন করতে পারবে।” সুলতান মাহমুদ আল-সালজুকির সময়ে একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল এত বড় ছিল যে, তা বহনের জন্যে চল্লিশটি উটের প্রয়োজন হয়েছিল।

 স্থায়ী হাসপাতালগুলো সংখ্যায় ছিল অনেক । আর এগুলো রাজধানী ও অন্যান্য বিভিন্ন শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। ইসলামী বিশ্বের প্রতিটি ছোট শহরে সেই সময়ে অন্তত একটি হাসপাতাল ছিল। এক কর্ডোভাতেই পঞ্চাশটি হাসপাতাল ছিল।

হাসপাতালগুলো ছিল বিভিন্ন ধরনের। সেনাবাহিনীর জন্য হাসপাতাল ছিল, যেগুলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা পরিচালিত হত, যাদের মধ্যে ছিলেন খলিফা, সেনাপতি ও বড় বড় নেতৃবৃন্দের চিকিৎসকগণ। বন্দিদের জন্যও হাসপাতাল ছিল। প্রতিদিন চিকিৎসকগণ ঘুরে ঘুরে সেখানে অসুস্থদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। বাগদাদের চিকিৎসকদের প্রধান সিনান ইবনে সাবিত কে মন্ত্রী ‘ঈসা ইবনে ‘আলী আল-জাররাহ এর লেখা একটি চিঠি থেকে পাওয়া যায়, “আমি কারাগারে থাকা মানুষগুলোর কথা ভাবছি। তারা সংখ্যায় অত্যধিক হওয়ায় এবং জেলের শুষ্ক পরিবেশের কারণে রোগাক্রান্ত হওয়াটা বলতে গেলে অনিবার্য । তাই আসলে, তাদের নিজস্ব চিকিৎসক থাকা উচিত যারা প্রতিদিন রোগীদের কাছে যাবে এবং ঔষধ-সিরাপ সরবরাহ করবে। এভাবে তাঁরা বিভিন্ন জেলে ঘুরতে থাকবে এবং অসুস্থদের চিকিৎসা দেবে।”

শহরের বড় মসজিদ এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান গুলোর কাছাকাছি  জরুরী সেবা প্রদানের জন্য থাকত জরুরী স্টেশন । আল-মাকরিজি[৫] বলেছেন যে, ইবনে তুলুন[৬] যখন কায়রোতে বিখ্যাত গ্র্যান্ড মসজিদ তৈরি করেছিলেন সেখানে ওযু করার স্থান ছিল, এবং পিছনের দিকে ছিল একটি ঔষধালয় যেখানে পাওয়া যেত বিভিন্ন ধরনের ঔষধ এবং সিরাপ । এছাড়াও সেখানে কয়েক জন সেবক এবং একজন চিকিৎসক থাকত । চিকিৎসক প্রতি শুক্রবার বসতেন এবং অসুস্থ মুসল্লিদের চিকিৎসা সেবা প্রদান  করতেন।

 জনসাধারণের চিকিৎসার জন্য সাধারণ হাসপাতাল ছিল। সেখানে দুটি পৃথক বিভাগ থাকত- একটি পুরুষ এবং অন্যটি মহিলাদের জন্য। প্রতিটি বিভাগেই ছিল প্রচুর সংখ্যক হল-রুম এবং প্রতিটি হল-রুম নির্দিষ্ট অসুখের রোগীদের জন্য বরাদ্দ ছিল, যেমন- দেহের অভ্যন্তরীণ অসুস্থতা, চোখের অসুখ, ক্ষত, অর্থোপেডিক্স ইত্যাদি। মানসিক রোগের জন্যও ছিল আলাদা ব্যবস্থা । অভ্যন্তরীণ অসুখের বিভাগটিতে ছিল আবার একাধিক কক্ষ, ফলে জ্বরের জন্যে ঘর ছিল, ডায়রিয়ার জন্যে ঘোর ছিল। প্রতিটি বিভাগের পরিচালনায় থাকতেন একজন প্রধান চিকিৎসক, ফলে অভ্যন্তরীণ রোগের পরিচালনায় থাকতেন একজন প্রধান চিকিৎসক, একইভাবে ক্ষত, অর্থোপেডিক্স, চক্ষু বিভাগে [ইত্যাদিতে] থাকতেন একজন করে। আর সব বিভাগের সমন্বিত নেতৃত্বে ছিলেন একজন সাধারণ প্রধান চিকিৎসক, তথা পুরো হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রধান, যাকে বলা হতো সা’উর । চিকিৎসকরা শিফটে কাজ করতেন এবং প্রত্যেক চিকিৎসকের একটি নির্দিষ্ট সময় ছিল যে সময়ে চিকিৎসার রুমে থাকতেন। প্রতিটি হাসপাতালেই বেশ কিছু সংখ্যক পুরুষ ও মহিলা সেবক, সহকারী এবং নার্স থাকত । তাদের জন্য পারিশ্রমিকও নির্ধারিত ও যথেষ্ট ছিল । প্রতিটি হাসপাতালে একটি ফার্মেসি থাকত যা খিজানাত আল-শরাব নামে পরিচিত ছিল, যেখানে বিভিন্ন ধরণের ঔষধ, সিরাপ, মূল্যবান ক্রিমের পাশাপাশি চমৎকার সংরক্ষণকারী পদার্থ (প্রিজারভেটিভ) এবং উন্নত মানের সুগন্ধিও পাওয়া যেত যা অন্য কোনো জায়গায় সেই সময় পাওয়া ছিল দুষ্কর । এমনকি সেখানে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি, কাঁচের পাত্র, বাটির সাথে সাথে এমন জিনিসপত্রও ছিল যেগুলো শুধু তৎকালীন রাজাদের ভাণ্ডারে পাওয়া যেত।

 হাসপাতালগুলো এক দিক থেকে চিকিৎসা বিদ্যার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানও ছিল বটে । কারণ প্রতিটি হাসপাতালেই থাকত একটি বড় লেকচার হল যেখানে সবচেয়ে সিনিয়র চিকিৎসকগণ অন্যান্য চিকিৎসক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে বসতেন । তাদের পাশেই থাকত যন্ত্রাদি এবং বই-পত্র । শিক্ষার্থীরা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা শেষ করে শিক্ষকের সামনে বসতেন । তারপর শিক্ষক এবং তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো এবং তারা মেডিক্যালের পাঠ্যবই থেকে পড়তেন। 

প্রায়ই  শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহারিক শিক্ষার জন্যে হাসপাতালের ভিতরে নিজেদের সাথে রাখতেন । সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে রোগীদের চিকিৎসা করতেন, যেমনটি হাল জামানার মেডিকেল কলেজগুলোতে দেখা যায় । ইবনে আবি উসায়বাহ[৭] (যিনি দামাস্কাসের নুরুদ্দিন বিমারিস্তানে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন) বলেন, “একদা আল-হাকিম[৮] মুহাযযিব আদ-দীন এবং আল-হাকিম ইমরান বিমারিস্তানে[৯] থাকা রোগীদের চিকিৎসা শেষ করার পরে আমি শেখ রাদি আদ-দীন আর-রাহবি এর সাথে বসলাম । তখন আমি দেখছিলাম কীভাবে তিনি  অসুস্থতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন, রোগীর রোগ নির্ণয় করেন এবং প্রেস্ক্রিপশন লিখেন। তার সাথে আমি অনেক রোগ এবং তার নিরাময়  নিয়ে গবেষণা করেছি ।”    

 একজন চিকিৎসককে ততক্ষণ চিকিৎসাসেবা চর্চা (practice) অনুমতি দেয়া হতো না যতক্ষণ না তিনি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সিনিয়র চিকিৎসকের সামনে একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেন । প্রার্থী যে বিশেষত্বে লাইসেন্স পেতে চান, সেই বিষয়ে তার পরীক্ষকের কাছে একটি থিসিস উপস্থাপন করতেন । এটি হয় তাকে নিজেকেই লিখতে হতো, অথবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্য কোনো পণ্ডিতের লেখার উপরে নিজের নিজস্ব স্টাডি এবং বক্তব্য (commentaries) যোগ করতে হত।  তাকে এইভাবে নিরীক্ষা করা হত এবং সেই ডিসিপ্লিন বা শাখার সাথে সম্পর্কিত সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন করা হত। যদি তিনি সঠিকভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতেন, তবে সবচেয়ে সিনিয়র চিকিৎসক তাকে একটি লাইসেন্স প্রদান করতেন যা ছিল মূলত তার জন্য চিকিৎসাসেবা চর্চার অনুমতি পত্র । খলিফা আল-মুক্তাদির এর সময়ে ৩১৯ হিজরীতে (৯৩১ খ্রিস্টাব্দ) একজন চিকিৎসক কোনো এক রোগীর চিকিৎসা করতে ভুল করায় রোগী মারা যান। খলিফা এরপর বাগদাদের সমস্ত ডাক্তারদের পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার আদেশ দেন । তাদের পরীক্ষা বাগদাদের সবচেয়ে সিনিয়র চিকিৎসক সিনান ইবনে সাবিত দ্বারা নেয়ানো হয়েছিল। কেবল বাগদাদেই এরকম পুনঃনিরীক্ষিত চিকিৎসকের সংখ্যা আটশত ষাটের বেশি ছিল, তাও বিখ্যাত চিকিৎসকগণ (যাদের পুনঃনিরীক্ষা করা হয়নি) এবং খলিফা, মন্ত্রি এবং শাসকগণের চিকিৎসকগণ বাদে।

তাছাড়াও আবশ্যিক উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো- তখন প্রতিটি হাসপাতালের সাথেই একটি করে পাঠাগার থাকত যেখানে চিকিৎসাবিদ্যার সাথে সাথে চিকিৎসক এবং ছাত্রদের প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ের বই দিয়ে ভরা ছিল। এমনকি এটাও বলা হতো যে, কায়রোতে ইবনে তুলুনের হাসপাতালে বিজ্ঞানের সকল শাখা মিলিয়ে এক লাখেরও বেশি খণ্ডের (ভলিউম) বই নিয়ে গঠিত এক পাঠাগার ছিল ।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রত্যেকের জন্য বিনামূল্যে ছিল। কী ধনী কী গরীব, কী কাছের কী দূরের, খ্যাত-অখ্যাত- কারও জন্য এর ব্যত্যয় ছিল না। প্রথমে, বাইরের হল-রুমে রোগীদের পরীক্ষা করা হতো । এরপর যাদের হালকা কোনো অসুখ থাকত, তাদেরকে সেটার প্রতিবিধান বলে দেয়া হতো, তারপর তারা হাসপাতালের ঔষধালয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় ঔষধ সংগ্রহ করত। যাদেরকে অসুস্থতার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করতে হতো, তাদের নাম নিবন্ধন করে স্নানঘরে প্রবেশ করানো হতো । তারপর তাদের পোশাক খুলিয়ে এক বিশেষ কক্ষে অপেক্ষার জন্যে রাখা হতো।

তারপর তাদেরকে হাসপাতালের পোশাক দেয়া হতো এবং এমন এক হল-রুমে প্রবেশ করানো হতো যেখানে শুধু একই অসুখে আগে থেকে ভোগা ব্যক্তিরা রয়েছে । প্রতিটি রোগীকে তার নিজস্ব সজ্জিত বিছানা দেওয়া হতো। তারপর তাকে চিকিৎসকের নির্দেশ মতো ঔষধ এবং তার সুস্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত খাবার[১০] প্রয়োজনীয় পরিমাণে দেয়া হত। রোগীর খাবারের তালিকায় থাকত ভেড়া, গরু, বিভিন্ন পাখি ও মুরগির মাংস, এবং রোগীর সুস্থ হওয়ার আলামত হিসেবে দেখা হতো রোগী এক বেলাতে একটি আস্ত রুটি এবং একটি আস্ত মুরগি খেতে পারছে কিনা। যখন কোনো রোগী আরোগ্য লাভ করতে (recovery phase) শুরু করত, তখন তাকে একই পর্যায়ের আরোগ্য-লাভকারী রোগীদের সাথে আলাদা কক্ষে স্থানান্তর করা হতো। এরপর যখন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠত, তখন তাকে একটি নতুন জামা এবং কিছু উক্ত কয়েকদিন কাজ করতে না পারার ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছু অর্থ-সাহায্য দেওয়া হত। হাসপাতালের কক্ষগুলো পানি প্রবাহিত করে পরিষ্কার করা হতো এবং হল-রুমগুলো সর্বোত্তম আসবাবপত্র দিয়ে সজ্জিত থাকত । প্রতিটি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিরীক্ষণের জন্য পরিদর্শক ছিল এবং আর্থিক নথিপত্র দেখার জন্য থাকত তত্ত্বাবধায়ক। প্রায়ই খলিফা কিংবা শাসক নিজেই পরিদর্শনে আসতেন এবং রোগীদের খোঁজখবর নিতেন এবং তাদের ভাল চিকিৎসা করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতেন ।

ইসলামি দুনিয়ায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে সকল হাসপাতালে এই সিস্টেম প্রচলিত ছিল– বাগদাদ, দামাস্কাস, কায়রো, জেরুজালেম, মক্কা, মদিনা, মাগরিব, আন্দালুসিয়ার হাসপাতাল… 


মূল লেখা: Mahdi Lock: Our Heritage and Legacy: Hospitals and Medical Institutions

ছবির সূত্র: 1001 Innovations

অনুবাদ- ফাহিম ফয়সাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *