শায়খ আহমাদ আশ-শামি- আদাব ও ইলমের প্রতিচ্ছবি

শাইখ আহমদ আশ-শামি (রহিমাহুল্লাহ) ছিলেন গত শতাব্দীর সিরিয়ার দুমা অঞ্চলের হাম্বলি মুফতি। দুমাতেই জন্মগ্রহণ করেন এবং বেড়ে উঠেন। ছোটবেলাতে তিনি পড়াশুনায় ভালো ছিলেন, কিন্তু এরপর কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। পিতার মৃত্যুর পরে পড়া ছেড়ে দিয়ে মা এবং আরেক ভাইয়ের খাবার যোগানোর জন্যে কাজে নেমে পড়েন। শুরুতে তিনি একটি রুটির দোকানে রুটি বানাতেন। সেখানে তিনি খেয়াল করেন, কিছু মানুষ ভালোমত পড়তে পারেন না। এরপর পাশাপাশি সামান্য অর্থের বিনিময়ে তিনি তাদের পড়াতে শুরু করেন।

তারপর তিনি ব্যবসার কাজে নামেন। দ্রুতই বিশ্বাসযোগ্যতা ও আদাবের জন্যে পরিচিত হয়ে উঠেন। বেশি দেরি না করে বিয়েও সেরে ফেলেন, ফলে তখন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান সালিহ আশ-শামি এবং আব্দুর রহমান আশ-শামির ভারও তাঁর উপর এসে পড়ে। নিজের কাজের ব্যস্ততা, সন্তানদের শিক্ষাদান ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে ইলম অর্জন থেকে সরিয়ে ফেলেননি। রিযিক তালাশ ও অন্যান্য কাজ বাদে যখন সময় পেতেন, তখন বিখ্যাত হাম্বলি আলেম ইমাম মুস্তফা বিন আহমদ ইবনে হাসান আশ-শাত্তির দরসে থাকতেন। তাঁর সহপাঠিদের মধ্যে ছিল পরের জমানার বড় কিছু আলেম, যেমন শাইখ মুহাম্মাদ আল-সায়্যিদ, শাইখ মুহাম্মাদ মুফিদ আল-নকশাবন্দি।

সহপাঠিদের সাথে তিনি হাম্বলি ফিকহে দলিলুত তলিব, গায়াতুল মুন্তাহা, গায়াহ, আকিদায় লুমাতুল ইতিকাদ এবং বিভিন্ন শারহ, এবং ইহসানে ইমাম সাফফারিনি, ইমাম বালবানি এবং মুস্তফা আশ-শাত্তির বিভিন্ন কিতাবপত্র অধ্যয়ন করেন। তাসাউফে তিনি ইমাম আব্দুর কাদির জিলানি এবং খালওয়াতি ধারার ছিলেন, যারা রাসূলুল্লাহর (সা) উপর দরুদ পাঠের জন্যে পরিচিত ছিল।

শাইখ আহমদের অন্য ভাইয়ের বয়স হলে বাজারে বেশকিছু কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেন, ফলে শাইখ আগের থেকে বেশি সময় পান। এরপর তিনি দামাস্কাসে এসে বিভিন্ন আলিমের নিকট অধ্যয়ন করেন। হাদিসশাস্ত্রে অনেক সময় দেন। ছোটবেলায় হিফয করার কারণে তাফসিরশাস্ত্র অধ্যয়ন তাঁর জন্য সহজ হয়ে উঠে।

এরপর একসময় তাকে ‘মারজা’ইয়াহর (আলেমদের কর্তৃত্বশীল উপাধি) প্রস্তাব দেওয়া হয়। শুরুতে তিনি নিজের জন্যে এটাকে অনেক বড় জিনিস মনে করেন এবং অসম্মতি জানান। পরে আলেম ও আওয়ামের অনুরোধে দশ বছর মুফতি থাকার পরে রাজি হন। তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কিছু আলেম পরামর্শ দেন, তিনি যেন দুমায় নিজ অঞ্চলে শাইখ মুস্তাফা আশ-শাত্তির সন্তানদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি এর আগেই একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন তরুণ এবং বৃদ্ধদের শেখানোর জন্যে- যাদের অনেকে হয়ত অল্প বয়সে পরিবারের জন্যে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছেন। জীবনব্যাপী তিনি ইলম শিক্ষাদান এবং দাওয়াতে নিয়োজিত থেকেছেন।

ফতওয়া দেবার আগে সবসময় তিনি ব্যক্তির নাম, পরিবার এবং সাধারণ অবস্থার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন, যাতে তিনি ফতওয়ার শর্ত আরোপ করার আগে ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। তিনি নিজে ফতওয়া লিখতেন না, মজলিসে বা ছাত্রদের সামনে বলতেন, তাঁর কিছু ছাত্ররা লিখে রাখতেন।

তাসাউফ এবং আদাবের জন্যে তিনি ছিলেন বিখ্যাত। শাইখ আব্দুর রাযযাক বলেছেন আদাবের দিক থেকে তাঁর মত কাউকে দেখেননি। বড়-ছোট সবার সাথে তিনি আদাব বজায় রাখতেন। শাইখ মুহাম্মাদ ওয়াইল আল-হানবালি বলেছেনঃ

“আল্লামা আহমদ আল-শামি [র], সিরিয়ার দুমায় হাম্বলিদের মুফতি। জীবিকার জন্য তিনি কাপড় বিক্রি করতেন। ছোটবেলায় আমি বাবার সাথে তাকে পরিদর্শনে যেতাম, এবং আমি দেখতাম তিনি বড়দের ন্যায় ছোটদের সাথেও শ্রদ্ধার সাথে আচার-ব্যবহার করতেন।

শাইখ মুহাম্মাদ আসলাম একটি হৃদয়জুড়ানো কাহিনী বর্ণনা করেছেনঃ

~একবার এক চোর শাইখের বাড়িতে ঢুকে চুরি করা শুরু করেন। শাইখ আবেগের সাথে বলেন, “এটা নিও না। এটা আরেকজনের আমানত এবং আমাকে শীঘ্রই ফিরিয়ে দিতে হবে। আমি তাদের হৃদয় ভাঙতে চাই না। এর চেয়ে আমার সম্পদ নাও।” এরপর তিনি নিজের সম্পদ তাকে দেন। চোর ভেবেছিল শাইখ তাকে চিনত না, সে সেটা নিয়ে চলে যায়।

পরের দিন সকালে শাইখ চোরের বাড়িতে নক করেন। তিনি আরও কিছু সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন, সাথে তাঁর চোখে ছিল পানি। চোর দরজা খুলার পর তিনি সেই সম্পদ তাকে দিয়ে বললেন, “বিচারের দিনে আমাকে ক্ষমা করে দিও! তুমি অর্থাভাবে ভুগছিলে, ফলে আমার থেকে চুরি করতে বাধ্য হয়েছিলে। যদি আমি সত্যিকারের মুমিন হতাম, তাহলে আমি কখনও তোমাকে এই অবস্থায় পৌঁছতে দিতাম না।”

তাঁর মুখে এই কথা শুনে চোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং তাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি এরপর তাওবা করেন এবং সৎকর্মশীল হয়ে যান।~

আলহামদুলিল্লাহ্‌। বর্তমানে শাইখের সন্তান শাইখ সালিহ আশ-শামি এবং শাইখ আব্দুর রহমান শামি বেঁচে আছেন এবং দুজনই আলেম। শাইখ সালিহ আশ-শামি বর্তমান সময়ের বড় মুহাদ্দিস এবং উপকারি কিছু কিতাব রচনা করেছেন, তাঁর একটি নামকরা কাজ হলো معالم السنة النبوية । দুই সন্তানের পাশাপাশি বর্তমানের আরেক সিরিয়ান হাম্বলি আলেম শাইখ ইসমাইল ইবনে বাদরান আদ-দুমি শাইখ আহমদ আশ-শামির ছাত্র ছিলেন।

১৪১৪ হিজরির সফর মাসে তিনি খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মৃত্যু আসে। শেষ দিনগুলোয় তিনি ঘরে থাকেন, মানুষকে সাক্ষাতে আসতে দিতেন। কখনও তিনি সাক্ষাৎ প্রার্থীকে ফিরিয়ে দেননি, দুমা কিংবা বাইরের সব প্রশ্নপ্রার্থীর প্রতি সুন্দর আচরণ করতেন।

আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুক এবং তাঁর থেকে আমাদের জীবনে শিক্ষা নেবার তওফিক দান করুক [আমীন]।

(শায়খ আসলামের ও দি হাম্বলি মাযহাব ফেসবুক পেইজ এবং মিরাস সাইট অনুসারে অনুলিখিত)

অনুলিখন- ফারশিদ খান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *