মুসলিম স্বর্ণযুগের শিক্ষাব্যবস্থার ৫ উপকারিতা

মূল লেখক: শাইখ ইসমাইল কামদার

এটা গোপন কোন বিষয় নয় যে আমি আধুনিক স্কুল ব্যবস্থার একজন সমালোচক। একটা গবেষণা যা মাত্র একশ বছর আগে শুরু হয়েছে, এই শিক্ষাব্যবস্থা ইতিমধ্যেই সেকেলে হয়ে গেছে এবং মিলিয়ন মিলিয়ন শিশুকে ব্যর্থ বানাচ্ছে।

যাইহোক, শিক্ষা সবসময় এমন ছিল না। মুসলিম স্বর্ণযুগে মাদরাসা ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল যা সেই যুগের কতিপয় শ্রেষ্ঠ মানস তৈরি করেছিল। 

নোট: এই লেখায় “মাদরাসা” বলতে প্রাচীন স্কুল ব্যবস্থাকে বুঝানো হচ্ছে যা গণিত, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে ধর্মীয় শিক্ষাও দিত। এখানে আধুনিক সেকুলারিত সংস্করণের কথা বলা হচ্ছে না যা বিভাজন করে এবং শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষায় ফোকাস করে। 

আমরা যতই এগিয়ে যাই এবং আমাদের বর্তমান সিস্টেমকে ঠিক করার চেষ্টা করি, আমরা পেছনে ফিরে তাকাতে পারি এবং পূর্বে বিদ্যমান সিস্টেমগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারি। মুসলিম স্বর্ণযুগের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যে পাঁচটি শিক্ষা নিয়ে আমরা আমাদের সময়ে প্রয়োগ করতে পারি:

১. ব্যক্তিগত সামর্থ্যের উপর ফোকাস করা

মুসলিম স্বর্ণযুগে মাদ্রাসা ব্যবস্থা সকল ক্ষেত্রে উপযুক্ত—এমন এপ্রোচ ছিল না। একজন সাত বছর বয়সী তরুণ ছাত্রও তার সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রেণিভুক্ত হত এবং তদানুযায়ী পড়াশোনায় নিযুক্ত হত। ফলে তাদের জীবনে প্রয়োগ হবে না এমনকিছু শেখাতে গিয়ে সময়ের অপচয় হত না।

ভাবুন তো! একজন ভাষাবিদের কেন হাইস্কুলের গণিত পড়তে হবে? অথবা একজন গণিতবিদকে কেন জটিল ব্যাকরণ পড়তে হবে? একজন ইতিহাসপ্রেমীকে কেন পরীক্ষায় পাসের জন্যে বৈজ্ঞানিক তথ্য মুখস্থ করতে হবে? অথবা একজন ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীকে কেন বিভিন্ন যুদ্ধের নাম-তারিখ মুখস্ত করতে হবে?

একজন ছাত্র যখন গোড়ার দিকে নিজের নিজ দক্ষতার ক্ষেত্র চিনতে পারে, তদানুযায়ী সে তার পড়াশোনার বিষয় নির্বাচন করতে পারে। এটা আমাদের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার দ্বিতীয় উপকারিতার দিকে নিয়ে যায়।

২. ছাত্র-ছাত্রীরা কম বয়সেই গ্র‍্যাজুয়েট হয়ে যেত

কম বয়সে শুরুর ফলে, কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবে তা নির্ধারণের জন্যে কমন শিক্ষা কার্যক্রমের দ্বারা ১৩ বছর সময় নষ্ট হত না। ফলে, মুসলিম স্বর্ণযুগে অনেক মহান বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক অনেক কম বয়সে প্র‍্যাক্টিস শুরু করেন।

ইবন বতুতা ২১ বছর বয়সে কাজী (বিচারক) হিসেবে গ্র‍্যাজুয়েট হন। ইবন সিনা ১৮ বছর বয়স থেকেই রোগী দেখা শুরু করেন। এমনকি, ১৭ বছর বয়সেই ইবন খালদুন ছিলেন ইসলামিক স্টাডিজে গ্র‍্যাজুয়েট!

এখানে আমরা সামর্থ্যের উপর ফোকাস করা ব্যবস্থার উপকারিতা দেখতে পাই। উপরের প্রত্যেকেই নিজ নিজ শাস্ত্রে কিংবদন্তী হয়েছিলেন। নিজেদের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ দক্ষতা ও সমৃদ্ধি অর্জনের জন্যে তারা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

কল্পনা করে দেখুন, বর্তমানে যদি আমরা অল্প বয়সে মানুষের সামর্থ্য খুজে বের করতে পারতাম, অল্প বয়সে তারা গ্র‍্যাজুয়েট হত এবং তারা অল্প বয়সেই তাদের লিগ্যাসির উপর কাজ করতে পারত। মানুষের জীবনের বড় একটা সময় যা সাধারণত অপচয় হয়, এই ব্যবস্থার অধীনে তাদের জীবনের সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ সময় হতে পারত।

৩. বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল

একটা মাত্র শিক্ষাব্যবস্থা সবার উপকার করে না। মানুষ বিভিন্ন উপায়ে শেখে, সুতরাং তাদের জন্যে বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা থাকা উচিত। যাতে করে, প্রত্যেক ছাত্র পড়াশোনার জন্যে এমন পদ্ধতি বেছে নিতে পারে যা তার পড়ার ধরনের সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মুসলিম স্বর্ণযুগের প্রথম পর্যায়ে আমরা এটা দেখতে পাই। কতিপয় মহান বিজ্ঞানীরা মাদরাসা ব্যবস্থায় পড়েছেন, আবার অন্যরা নিজেদের বাসায় পড়েছেন। অনেকে গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, আবার অন্যরা নিজ শিক্ষকের সামনাসামনি বসে জ্ঞানার্জন করেছেন। এমনকি কেউ কেউ জীবনের বিভিন্ন সময়ে এই সবগুলোর মধ্য দিয়ে গেছেন।

সুতরাং শিক্ষাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে, এক ব্যবস্থা সবার জন্যে উপযুক্ত—এই চিন্তা বন্ধ করতে হবে। আমাদের আরও বৈচিত্র্য প্রয়োজন। কেউ যদি অতিপড়ুয়া হয়, তাকে বাসায় থেকে যত সম্ভব বই পড়তে দিন। কেউ যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা ভাল শেখে, তাকে সেজন্যে স্কুল থেকে নিয়ে গিয়ে গবেষণাগারের ব্যবস্থা করে দিন। (যা আইনস্টাইনের বাবা-মা করেছিলেন)

বিশ্বের আরও নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন। যাতে করে পড়ুয়াদের লেকচার করতে গিয়ে আটকে থাকতে না হয়, বাস্তবিক উপায়ে যারা শেখে তাদের যেন ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকতে না হয়। আধুনিক বিশ্বে আমাদের এই কাজটা করার উপায় খুজে বের করতে হবে। ইন্টারনেট এটা আগের চেয়েও অধিক সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।

৪. তারা বিষয়গুলোকে ধর্মীয় ও দুনিয়াবি—এভাবে ভাগ করতেন না

আধুনিক বিশ্বে স্কুল ও মাদরাসার পৃথকীকরণ উপনিবেশায়নের ফলাফল। মুসলিম মানসে এর প্রভাব ভয়াবহ। একটা পুরো প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে এই ভেবে যে গণিত, বিজ্ঞান ও ভাষার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। আর ইসলাম শুধু বিকালে পড়ার বিষয় কিন্তু “দুনিয়াবি” বিষয়গুলো হচ্ছে প্রায়োরিটি। 

বাস্তবতা হচ্ছে ইসলাম আমাদের সব ধরনের উপকারী জ্ঞানার্জনের শিক্ষা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে আকিদা (ইসলামি বিশ্বাস), ফিকহ (ইসলামি আইন), ইতিহাস, গণিত, বিজ্ঞান, ব্যবসা, ব্যক্তিগত উন্নতি এবং অন্য সবকিছু যা আমাদের উপকার করে।

মুসলিম স্বর্ণযুগে এটা ছিল সাধারণ নিয়ম। আল-খাওয়ারিজমি আল-জেবরা (বীজগণিত) আবিষ্কার করেছিলেন ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের জটিল সমস্যা সমাধানের জন্যে। ইবন সিনা চিকিৎসাশাস্ত্রে নিবিষ্ট হয়েছিলেন কারণ রাসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন প্রত্যেক রোগের চিকিৎসা র‍য়েছে। ইবন খালদুন ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন কারণ কুরআন আমাদের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলে। এই সবগুলো ছিল একে অপরের সাথে জড়িত। আমাদের সেই শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত যা বিষয়গুলোকে ধর্মীয় ও দুনিয়াবি হিসেবে ভাগ করবে না। আসল ব্যাপার হচ্ছে উপকারী জ্ঞান।

৫. শিক্ষা উর্ধ্বতন উদ্দেশ্য (Higher Purpose) রাখত

মুসলিম স্বর্ণযুগে প্রাথমিকভাবে সম্পদ, খ্যাতি ও পদমর্যাদার অর্জনের জন্য জ্ঞানার্জন করা হত না। (যদিও এমন উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জন করা লোক বিদ্যমান ছিল) মাদরাসা ব্যবস্থার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল এমন নাগরিক তৈরি করা যারা আল্লাহর ইবাদত করবে ও আল্লাহর সৃষ্টির তত্ত্বাবধান করবে।

শিক্ষা ছিল সমাজের জন্যে, নিজের জন্যে নয়। আল্লাহর জন্যে, প্রবৃত্তির জন্যে নয়। দুনিয়াকে উত্তম জায়গা বানানোর জন্যে, শুধুমাত্র কারও পকেট ভর্তির জন্যে নয়। এজন্যে, মুসলিম স্বর্ণযুগে আমরা আমরা খুজে পাই বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা (এমনকি প্রাণীদের জন্যেও), বিনামূল্যে শিক্ষা, সাদকার কাজে পুরো ব্যবস্থা। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষেরা ছিল অধিক সুখী।

যে শিক্ষাব্যবস্থা আত্মসর্বস্ব বস্তুবাদী সফলতার উপর ফোকাস করে ব্যর্থতাই তার নিয়তি। এমন ব্যবস্থা আত্মমুগ্ধ (Narcissist) ও স্বার্থপর ব্যক্তি তৈরি করে। এটা আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফোকাস করার কথা ভুলিয়ে দেয়: স্রষ্টাকে তার সৃষ্টির সেবার দ্বারা সন্তুষ্ট করা।


মূল লেখা: Ismail Kamdar – 5 Ways Education was better in the Muslim Golden Age | Facebook

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *