মাযহাবি ও লা-মাযহাবিদের সমন্বয়

শায়খ ড. ওয়ালিদ আল-মানিসি

ফিকহের জন্যে দুটো রাস্তা রয়েছে-

প্রথম পন্থা হলো মাযহাবগুলোর ফিকহি মতন অধ্যয়ন করার মাধ্যমে। এটাকে ফিকহি/ফিকাহবিদদের পন্থা বলা যায়। উদাহরণস্বরূপ, হাম্বলি মাযহাব অনুসরণকারী কেউ প্রাথমিক পর্যায়ে ইমাম বুহুতি [র] রচিত উমদাতুত তলিব অথবা ইবনে বালবান [র] রচিত ‘আখসার আল-মুখতাসারাত’ পড়বে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে সে ইমাম হাজ্জাউইর [র] ‘যাদুল মুস্তকানি’ অথবা মারঈ আল-কারমির ‘দলিলুত তলিব’ পড়বে। তৃতীয় ধাপে গিয়ে সে ইমাম ইবনে নাযযার আল-ফুতুহির [র] ‘মুনতাহা-আল-ইরাদাত’ অথবা মুসা-আল-হাজ্জাউই [র]-র ‘আল-ইকনা’ পড়বে। চতুর্থ ধাপে গিয়ে সে ইবনে কুদামাহ [র]-র ‘আল-কাফি’ অথবা আল-মাজদ আব্দুস সালাম ইবনে তাইমিয়ার [র] (শাইখুল ইসলামের দাদা) ‘আল-মুহাররার’ পড়বে। এভাবে, প্রত্যেকটি মাযহাবের শিক্ষার্থীরা উক্ত মাযহাবের আলিমদের অনুসৃত পন্থায় অনুসারে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করবে।

দ্বিতীয় রাস্তা হচ্ছে, হুকুম-আহকামের হাদিসসংক্রান্ত কিতাব ও মূল হাদিসের কিতাব হতে ফিকহ অধ্যয়ন। এটাকে মুহাদ্দিসগণের পন্থা বলা যেতে পারে। এতে ছাত্ররা আহকামের হাদিসের কিতাবগুলো অধ্যয়ন করবে, যেমন আল-মাকদিসির ‘উমদাতুল আহকাম’, এরপর ইবনে হাজরের [র] ‘বুলুগুল মারাম’, এরপর ইবনুল হাদির ‘আল-মুহাররার’, এরপর [ইবনে তাইমিয়ার] দাদা, আব্দুস সালাম ইবনে তাইমিয়ার [র] ‘আল-মুনতাকা’। এরপর হাদিসের কিতাবগুলো, যেমন বুখারি-মুসলিম এবং চার ‘সুনান’, ব্যাখ্যাসহ।

প্রথম পন্থার সুবিধা হলো- এটি ফিকহি মাসায়েলের ব্যাপারে পারদর্শী ও প্রস্তুত, ফিকহি সমস্ত শাখাপ্রশাখার ভাণ্ডার এবং ফকিহদের দুর্বোধ্য ইবারতের সাথে প্রশিক্ষিত করে তোলে, যার ফলে সে নিজে থেকে মাযহাবগুলোর কিতাবাদিতে গবেষণা করতে সক্ষম হয়। তাছাড়া সে আহলুল ইলমের সাথে মাসায়েলগুলোর বুঝ ও আয়ত্তকরণে দক্ষ হয়ে উঠে।

প্রথম পন্থার অসুবিধা হচ্ছে, এই পথের মধ্যে সীমাবদ্ধ ব্যক্তির সুন্নাহর জ্ঞান ও এবং দলিল প্রয়োগের পদ্ধতির [ইস্তিদলাল] ব্যাপারে বুঝে কমতি থাকে। তাছাড়া, উলামাদের ব্যাপারে চরমপন্থী হয়ে উঠতে পারে, চিন্তাভাবনায় স্থবিরতা হয়ে যেতে পারে এবং ফিকহি মাসায়েল থেকে উদ্ভুত বিষয়ে ব্যাপারে গবেষণার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয় পথের সুবিধা হচ্ছে, এখানে পক্ষপাতিত্ব বা তাআসসুব এবং একটি মত নিরেটভাবে ধরে রাখার ব্যাপারটি কম। সুন্নাহর প্রতি ভক্তি, উলুমুল হাদিস ও রাবিদের ব্যাপারে জানা ও শেখা, আকিদা, আখলাক, আদাব ও সিরাতের বিভিন্ন ফাওয়াইদ অধ্যয়নের মাধ্যমে বিশদ জ্ঞান-বুঝ হওয়া। অসুবিধা হচ্ছে ফিকহে প্রমাণাদি শুধুমাত্র সুন্নাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, হুকুম-সংক্রান্ত কুর’আনের আয়াত, ইজমা, কিয়াস, মদিনার আমল, সাহাবীদের [রা] আমল, মাসালিহ মুরসালা ইত্যাদি। এভাবে, প্রত্যেকটি বা’ব বা চ্যাপ্টারে ছাত্ররা ফিকহের ফুরুর অনেককিছু মিস করে, কেননা সেগুলো হাদিস থেকে সরাসরি আহরণ করা হয় না। উদাহরণস্বরূপ, [হাম্বলি ফিকহের] সংক্ষিপ্ত মতন যাদুল মুস্তাকনিতে প্রকাশ্যভাবে দু’হাজার চারশ মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আর পরোক্ষভাবে উদ্ভুত মাসায়েল ধরলে গণনা করলে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার। মালেকি ফিকহের মুখতাসার খলিলে প্রাপ্ত সংস্করণে সরাসরি মাসায়েলের সংখ্যা পনের হাজার, আর পরোক্ষ মাসায়েল ধরলে এ সংখ্যা পৌঁছে এক-লাখে।

যেহেতু আহকাম-সংক্রান্ত হাদিসের বইগুলোতে ফিকহি বিষয়সমূহের সংখ্যা এর চারভাগের এক ভাগও হয় না, তাই মাঝেমধ্যে তা ছাত্রকে শেখার শুরুতে প্রতারিত হওয়া, ফকিহদের সাথে অনধিকার চর্চা এবং প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়া ইজতিহাদ এবং তারজিহ দেওয়াতে ধাবিত করে। তাছাড়া, ছাত্ররা একটি বিষয় শেষ না করে আরেকটিতে পা বাড়ানোর কারণে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এছাড়াও, একটি নির্দিষ্ট মাসআলা বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত হতে পারে, এবং এই আলোচনা বিভিন্ন হাদিসে পুনরাবৃত্তি হতে পারে, কিন্তু সে হাদিসগুলো একসাথে নেই।

এসকল কারণে, উপদেশ হলো দুটো পন্থার মধ্যে সমন্বয় করা। ফিকহ চার মাযহাবের একটির মাধ্যমে শায়খের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অধ্যয়ন করা, সাথে সাথে আয়াতুল আহকাম ও আহাদিসুল আহকামের কোনো কিতাব অধ্যয়ন করা। আর উত্তম হবে,উভয়ের লেখকই একই মাযহাবের হওয়া, যাতে মাসায়েলে পরস্পর বিরোধী তারজিহের কারণে কেউ বিচ্যুত হয়ে না যায়।

মাযহাবে নিসবতকারীরা সাধারণত প্রথম পন্থায় নিজেদের আবদ্ধ রাখে, কিন্তু তাদের মধ্যে সফল হচ্ছে তাঁরা যারা দুটো পন্থাকে একত্রে সমন্বয় করে। অন্যদিকে লা-মাযহাবিরা সাধারণত দ্বিতীয় রাস্তায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে।

নির্দিষ্ট মাযহাবের সাথে সম্পর্ক উম্মাহর ফকিহদের পন্থা। এভাবে, ইমাম ইবনে তাইমিয়া [র] , ইবনে কায়্যিম [র] এবং ইবনে আব্দুল ওয়াহাব [র] ছিলেন হাম্বলি। ইবনে কাসির [র] এবং ইমাম আয-যাহাবি [র] ছিলেন শাফেয়ী। ইমাম তাহাবি ছিলেন হানাফি, ইবনে আব্দিল বার [র] ছিলেন মালেকি। মাযহাব স্থিতিশীলতা থেকে- বরং তারও আগে থেকেই ব্যাপারটি এরুপ হয়ে আসছে। সাহাবীদের [র] ফুকাহাদের প্রত্যেকেরই ছাত্র ছিল যারা মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেগুলো ছিল ভিত্তিপ্রস্তর যা পরবর্তীতে মাযহাবগুলোয় পরিণত হয়েছে।

কোনো ছাত্রের বুদ্ধিমত্তা এবং উঁচু হিম্মত যে পর্যায়েই পৌঁছাক না কেন, সে হাদিস, ভাষা, উসুল, কাওয়াইদ ইত্যাদি দ্বারা বিস্তর প্রমাণাদি অধ্যয়নের মাধ্যমে প্রত্যেকটি বিষয়ে মুজতাহিদ হতে পারবে না। তাকে বেশিরভাগ ফিকহি ইস্যুতে তাকলিদ করতে হবে। নির্দিষ্ট মাযহাবের প্রতি নিসবত তাকে প্রশান্ত রাখবে এবং একই ওজনের বিভিন্ন দলিল ও এক মতের উপর অন্য মতের প্রকাশ্য প্রাধান্য না থাকলে এটা উত্তম হবে- সে নিজ ইমামকে অনুসরণ করলো।

সাম্প্রতিক সময়ে যারা কোন নির্দিষ্ট মাযহাবে থাকা বা অনুসরণ করার বিরোধিতা করে, তাঁরা শেষমেশ ইবনে বায, ইবনে উসাইমিন বা ইমাম আলবানি রহিমাহুমুল্লাহর অনুসরণ [বা তাকলিদ] করে বসে। ফলে তাঁরা চার আইম্মাহর অনুসরণ থেকে পালিয়ে তাদের থেকে [জ্ঞানে] কম কারও অনুসরণ করে বসেন।

লা-মাযহাবিদের এই ব্যাধি তাদের বেশিরভাগ আসহাবকেই শায (বিচ্ছিন্ন) মতের দিকে ধাবিত করে। এগুলো হলো এমন ধরণের মত, যা সালাফ কিংবা মাযহাবগুলোর মাত্র একজন ফকিহ পোষণ করেছেন।

যতক্ষণ মাযহাবিরা তাদের মতকে চার মাযহাবের একটির নির্ভরযোগ্য/মুতামাদের উপর ভিত্তি করে, তাদের মাযহাবের মুতামাদ বা নির্ভরযোগ্য মত কখনো কোনো শায মত হবে না। কেননা প্রত্যেকটি মাযহাব শুধুমাত্র তাদের ইমামের প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং তা শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে হাজারো ফকিহ-বিশিষ্ট একটি মাযহাবের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা সেই মতগুলোর উপর নির্ভর করেছেন এবং সেগুলোকে অধিক শক্তিশালী মনে করেছেন।

আর আল্লাহ্‌র মাধ্যমেই সফলতা।


অনুবাদ- ফারশিদ খান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *