বাঙ্কে লালের গল্প

(উত্তর প্রদেশ, ভারত – ১৯৬০ সাল)

বাঙ্কে লাল নামের ১৬ বছরের এক কিশোরের হাতে এলো একটা ছোটো বই। নাম “দীনে হাক্ব” অর্থাৎ “সত্য ধর্ম”। বইয়ের এক জায়গায় তার চোখ আটকে গেলো, “নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম হলো ইসলাম”। খুবই আজিব এক দাবী! সে ভাবলো, এটা কেমন কথা! এতোদিন তো জেনে আসলাম যে খোদাকে পাবার জন্য যে ধর্মই পালন করি না কেনো খোদাকে পাওয়া যাবে। এখন ইসলাম এসে কী একটা আজিব দাবী করে বসলো!

বাঙ্কে লাল হিন্দু পণ্ডিতদের কাছে গেলো কৌতুহল নিয়ে। উদ্দেশ্য হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে জেনে ইসলামকে ভুল প্রমাণ করা। কিন্তু হিন্দু পণ্ডিতদের প্রশ্ন করে সে সদুত্তর খুঁজে পেলো না। তার দু একজন মুসলিম বন্ধু ছিলো। সে তাদেরকে ইসলাম নিয়ে নানা প্রশ্ন করতো, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিলো ইসলামকে হিন্দু ধর্মের আলোকে রিফিউট/ভুল প্রমাণ করা। ঘটনাক্রমে তার হাতে এলো হিন্দি ভাষায় অনুদিত কুর’আন মাজীদের একটা কপি। সে কুর’আন পড়তে লাগলো, হিন্দু পণ্ডিতদের কাছে যেতে লাগলো হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন বিষয় জানার জন্য। এভাবে ছয়-সাত মাস যাওয়ার পর সে কঠিন এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলো, সে মুসলিম হবে। ব্রাহ্মণ হিন্দুর ঘরে জন্মানো ১৬ বছরের সেই কিশোরের জন্য এটা আসলেই যথেষ্ট কঠিন এক সিদ্ধান্ত ছিলো। তার এলাকায় হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়া খুব একটা প্রচলিত ঘটনা ছিলো না, অন্তত গত কয়েক শতকে তো এরকম ঘটনা এই প্রথম।

স্বাভাবিকভাবেই নানা সমস্যা হতে লাগলো। সে সিদ্ধান্ত নিলো উত্তর প্রদেশ ছাড়ার। এক-দেড় বছর এই শহর থেকে ঐ শহরে ঘোরাঘুরি করে সে থিতু হলো দক্ষিণ ভারতের এক মাদ্রাসায়। সেখানে ইসলামের ওপর একাডেমিক পড়াশোনা করে ১৯৬৬ সালে পাড়ি জমালো সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় শেখ বিন বাজ, শেখ শানক্বিতির মতো আলেমরা জীবিত। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামি শরীয়ার ওপর ব্যাচেলর শেষ করে মাস্টার্সের জন্য ভর্তি হলেন মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার মাস্টার্সের টপিকটা ছিলো খুবই চিত্তাকর্ষক! যে সাহাবী সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন তিনি হলেন আবু হুরাইরা(রাঃ)। প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক বর্ণনা তাঁর থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন অনেক পরে। রাসুল(সঃ) এর সহচর্য পেয়েছিলেন মাত্র ৩-৪ বছর। এই অল্প সময় রাসুল(সঃ) এর সহচর্যে থেকে কীভাবে তিনি এতো হাদিস বর্ণনা করলেন তা নিয়ে অনেকের আপত্তি ছিলো। বাঙ্কে লাল এই বিষয়ে গবেষণা করে দেখলেন যে, আবু হুরাইরা(রাঃ) থেকে প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক সনদে বর্ণনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সব মিলিয়ে বর্ণিত হাদিস হবে ১৫০০ থেকে বড়জোর ২০০০। মানে, একই হাদিস আবু হুরাইরা(রাঃ) থেকে একাধিক লোক বর্ণনা করায় সব মিলিয়ে বর্ণনার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক হলেও মূলত বর্ণিত হাদিস ১৫০০ থেকে ২০০০ এর মত। বাঙ্কে লাল দেখলেন যে, আবু হুরাইরা(রাঃ) রাসুলের সহচর্যে ছিলেন প্রায় এক হাজার দিনের মতো। একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, তিনি সবসময় রাসুলের সাথে থাকতেন। অন্য সাহাবিরা যেখানে ব্যবসা-বানিজ্য, ক্ষেতখামারে কাজ করতেন, সেখানে আবু হুরাইরা জ্ঞানার্জনের জন্য পরে থাকতেন রাসুলের কাছে। একটু হিসেব করলেই দেখা যাচ্ছে যে, আবু হুরাইরা(রাঃ) গড়ে প্রতিদিন একটি থেকে দুটি করে হাদিস মুখস্ত করেছেন, যা খুবই সহজ ছিলো সেই সময়ের প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী আরবদের জন্য। তার মাস্টার্সের থিসিসের প্রশংসা করলেন অনেকে, অনেকেই এর ওপর ভিত্তি করে দাওয়াতের ময়দানে আবু হুরায়রা(রাঃ) এর প্রতি উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দিলেন। একজন মাস্টার্সের শিক্ষার্থীর জন্য এটা বেশ বড় ব্যাপার ছিলো।

এরপর তিনি মিসরের বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদিসের ওপর পিএইচডি করেন। পিএইচডি শেষে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু তখনো জীবনের সেরা কাজটা করা তার বাকি ছিলো। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কয়েকশ হাদীস এর বই থেকে শুধুমাত্র সহীহ হাদিসগুলোকে বাছাই করে এক জায়গায় করলেন। ১২ খণ্ডে প্রকাশিত হলো ১৬,৮০০ সহিহ হাদিস সম্বলিত এনসাইক্লোপিডিয়া- “আল জামী আল কামিল ফিল হাদিস আস সাহীহ আল শামিল”, যেখানে তিনি সব সহিহ হাদিসকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম কেউ যিনি একটি বইয়ে সব সহিহ হাদিসকে সংকলন করেছেন।

১৯৪৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে জন্ম নেওয়া বাঙ্কে লাল ২০২০ সালের ৩০শে জুলাই সৌদি আরবে মৃত্যুবরণ করেন। ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে উঠে আসা বাঙ্কে লালকে আজ সবাই চেনে শাইখ জিয়াউর রহমান আজমী নামে, তালেবে ইলমদের জন্য যিনি রেখে গেছেন এক অবিস্মরণীয় লেগেসি। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দিক।

(ড. ইয়াসির কাযির নেওয়া শাইখ জিয়াউর রহমান আজমীর সাক্ষাৎকার অনুসারে অনুলিখিত)

অনুলিখন- ফারহান সাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *