তাযকিয়া ও তারবিয়ার ব্যাপারে ইমাম মুহাসিবি ও আল্লামা আবু গুদ্দাহর নসীহত

মূল কিতাব:রিসালাতুল মুস্তারশিদীন

লেখক:ইমাম হারেস আল মুহাসিবি (মৃত্যু- ২৪৩ হিজরি)

ব্যাখ্যাকারক:আল্লামা আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (মৃত্যু- ১৪১৮ হিজরি)


ব্যক্তির আক্বল ও নফস হলো তার চালিকাশক্তি। এ-দুটো জিনিসের ইসলাহ ও তারবিয়ার ব্যাপারে যুগে যুগে উলামায়ে কেরাম ও সুফিয়ানে কেরাম বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইসলাহ ও তাযকিয়ার জন্য তরিকার শায়খের বাই’আতের জরুরত কীরুপ এবং বর্তমান যুগে তালিম ও তারবিয়ার সঠিক রাস্তা কীরুপ হতে পারে সে ব্যাপারে ইমাম মুহাসিবির কিতাব রিসালাতুল মুস্তার্শিদিনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার চেষ্টা করবো। 

ইমাম হারেস আল মুহাসিবি কুর’আন ও সুন্নাহ থেকে শিক্ষা নেয়ার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে নবীজির হাদিস উল্লেখ করেন, 

“তোমাদের উপর আমার সুন্নত ও আমার পরে আসা খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের ইত্তেবা করা জরুরী, এর উপর শক্ত করে ধরে থাকো ও আমল করো।” [তিরমিযি, আহমাদ, ইবনে মাজাহ]

সাথে আরও বলেন, 

“এবং জেনে রাখো, কিতাবুল্লাহ তোমাদের উপর ফরজ করেছে এর আদেশ ও নিষেধের উপর আমল করা, এর ওয়াদার উপর আশা রাখা এবং সতর্কবাণীগুলোর ব্যাপারে ভয় থাকা, অস্পষ্ট আয়াতের উপর ঈমান আনা, এবং ফরজ করেছে এর মধ্যে বর্ণিত ঘটনা ও উদাহরণসমূহ থেকে শিক্ষা নেয়া। আর যদি তুমি এগুলো আয়ত্ত করতে পারো তাহলে তুমি জাহালতের অন্ধকার থেকে ইলমের নূরে প্রবেশ করবে, সন্দেহ নামক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে স্বস্তির ইয়াক্বিনের দিকে।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন, ‘আর যারা আল্লাহকে অভিভাবক হিসেবে নিয়েছে তারা অন্ধকার থেকে বের হয়ে আলোতে এসেছে’ [সুরা আল-বাক্বারা]।”

শায়খুল আল্লামা আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ বলেন,

“ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল মুহাসিবির এই বক্তব্য দ্বারা আরো পরিষ্কার হয় যে আল্লাহর দিকে হিদায়াতের বিষয় ও নফসের পরিশুদ্ধি শায়খ ও তাঁর বাই’আতের উপর লেগে থাকাতেই শেষ নয়। বরং তা শেষ হয় আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের ইলম অর্জনে, এর উপর আমলে, কুর’আন ও সুন্নতের উপর লেগে থাকা এবং উম্মতের অগ্রবর্তীদের রাস্তায় চলার মাধ্যমে।

তাই যে সালেক আল্লাহর কিতাব, তাঁর রাসূলের সুন্নত ও খুলাফায়ে রাশেদীন, সালাফুস সলিহীনের রাস্তার উপর লেগে থাকে সে হিদায়াতের রাস্তা পেয়েছে।”

ইমাম আল মুহাসিবির উল্লেখিত হাদিসের ব্যাপারে আলোকপাত করে আল্লামা আবু গুদ্দাহ আরো বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখিয়ে যাওয়া হিদায়াতের রাস্তা তাঁর কথা ও কাজের মধ্যেই নিহিত। এবং এই কথা ও কাজ কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতে মুহাম্মাদির হিদায়াতের জন্য জরুরী থাকবে।”

হাদিস শরীফে একের অধিক বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে আল্লাহর রাসূল তাঁর সুন্নত ও খুলফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের উপর ইস্তিক্বামাতের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। 

কেউ কেউ বলেন, “যে এটা ভেবেছে যে শুধু তাদাব্বুরের সাথে কুর’আনের তিলাওয়াত ও নবীজির হাদিসের উপর লেগে থেকে সে নিজের অন্তরের অসুখের এলাজ বা আরোগ্য লাভ করবে সে মারাত্মক ভুলের উপরে আছে। স্বয়ং রাসূলের সাহাবীগণ এর মাধ্যমে নিজেদের ইসলাহ করতে পারেন নি”- এগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য মারাত্মক অসম্মানজনক, আল্লাহ ও রাসূলের বক্তব্য বিরোধী কথা।

এ প্রসংগে আল্লামা আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ একটি ঘটনা উল্লেখ করেন যেখানে মু’আল্লিফে মুয়াফাক্বাত ইমাম শাতেবী ও উনার জমানার তাসাওউফের ইমাম খতিবে জামে কায়রাওয়ান শায়খ আবু আব্দুল্লাহ ইবনে ইবাদ আল নাফঝির মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান হয় একটি বিশেষ মাস’আলা নিয়ে।

এই মাস’আলাটি নিয়ে গ্রানাদার উলামায়ে কেরাম মতপার্থক্যে উপনীত হয়েছিলেন। এবং দুপক্ষ থেকে অনেক কথাবার্তা এদিক ওদিক যাচ্ছিল। মাস’আলাটি হলো এই যে- একজন ব্যক্তি, যে আল্লাহকে পেতে চায়, তার জন্য কি তাসাওউফের নির্দিষ্ট তরীকার শায়খের কাছে বাই’আত দেয়া আবশ্যক? নাকি তার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, কোনো তরিকার শায়খের কাছে বাই’আত ব্যতীত সে ইলমের রাস্তায় চলে ও আহলে ইলমের কাছ থেকে ইলম যাচাই করে নিবে?

ইমাম শাতেবীর চিঠির উত্তরের খুলাসা পাওয়া যায় ইমাম ইবনে ইবাদ আল নাফঝির রাসা’ইলে সুগরা কিতাবে। ইমাম আল নাফঝি লিখেন, যা বললেন তার খুলাসা হলো এই যে,

“সুলুকের শায়খ দুই ধরনের।

  • শায়খে তা’লিম ওয়া তারবিয়া,
  • শায়খে তা’লিম বিলা তারবিয়া (শুধুই ইলমের শায়খ)

প্রথম প্রকারের শায়খ সবার জন্য জরুরী নয়। শুধু সেই ব্যক্তির জন্যই শায়খে তারবিয়া ও তালিম জরুরী যার আকল দুর্বল এবং নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ কম (যেদিকে নফস টানে সেদিকেই ঝুকে পড়ে, অর্থাৎ আকল নফসের নিয়ন্ত্রণে থাকে)। তাদের জন্য শায়খে তারবিয়া জরুরী কারন তাদের নফস তাদের উপর ভারী হয়ে আছে। এবং শায়খে মুরব্বীর সোহবত ব্যতীত সেই নফসের ভার সরানো কঠিন।

আর যার আকল শক্ত, নফসের উপর শক্ত দখল আছে তার জন্য শায়খে তারবিয়ার জরুরত নেই। অপরদিকে প্রত্যেক সালেক/আল্লাহকে পেতে চাওয়া ব্যক্তির জন্য শায়খে তালিম জরুরী (লাযেম)।

যারা আক্বলবান ও নফসকে নিয়ন্ত্রনে রাখে তাদের জন্য শায়খে মুরব্বী জরুরী নয়। আক্বলবান ব্যক্তির আক্বল ও তাঁর নিয়ন্ত্রিত নফস তাঁর জন্য যথেষ্ট। তাই সে আমলের উপরে ইস্তিক্বামাত থাকতে পারে, এবং তাকে তা’লিমের শায়খের দিকে নির্দেশিত করে যা দুর্বল আকলের ব্যক্তির ব্যাপারে বলা যায় না। তাঁর ব্যাপারে এই ভয় নেই যে সে সুলুকের রাস্তায় চলার সময় নিজের উদ্দেশ্য থেকে সরে বিপথে চলে যাবে। আর সে এগুলো লাভ করে আল্লাহর অনুগ্রহে।  

শায়খে তরিকা/তারবিয়ার সোহবত হলো আহলে তাসাওউফের পরবর্তীদের আমল, আর প্রথম দিককার আহলে তাসাওউফের  আমল হলো আহলে ইলমের সোহবত। হারেস আল মুহাসিবি, আবু তালেব মক্কীর কিতাবাদীতে এর স্পষ্ট উল্লেখ আছে। তারা তাদের কিতাবে তাদের শায়খদেরকে থেকে বক্তব্য উল্লেখ করতেন না, বরং ইলমের উসুল ও ফুরু’, সাওয়াবিক, লাওয়াহিক উল্লেখ করতেন, বিশেষ করে আবু তালেব মক্কী। এটা হলো দলীল যে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য তরিকতের শর্তকে সবার জন্য লাযেম করা যাবে না।

শায়খে মুরব্বীর এই ধারা সালাফের প্রথম জমানাতেও ছিল। তাদের কাছ থেকে সালেকীনদের মত তাসাওউফের বিশেষ আমলের উদাহরণ পাওয়া যায় না। কিন্তু তারা সবসময় ইলমের থেকে ফায়দা নেবার হালে থাকতেন, একে অপরের সোহবতের মাধ্যমে নিজেদের উপর মেহনত করতেন। আর তা-ই তাদের যাহের ও বাতেনের উপর প্রভাব ফেলতো।

আহলে তাসাওউফের কিতাবেও আহলে ইলমের কাছে বারবার ফিরে যাওয়ার তাকিদ এসেছে কারণ আহলে ইলমের নেগরানি বাদে তারবিয়া সম্পূর্ণ ও সহীহ হয় না।”


লিখেছেন: রায়হান মাহমুদ

Photo Courtesy: Aaron’s Worldwide Adventures


লেখক পরিচিতি: ইমাম হারিস আল-মুহাসিবি, পুরো নাম আবু আব্দুল্লাহ হারিস বিন আসাদ বিন আব্দুল্লাহ আল আনিযি আল বাসরি। তিনি প্রসিদ্ধ আল-মুহাসিবি নামে, এই নামের উৎপত্তি হলো আরবী মুহাসাবা থেকে যার অর্থ হলো আত্মনিরীক্ষা। 

জন্ম বসরায়, আব্বাসি খিলাফতের জমানায় তিনি বাগদাদে প্রসিদ্ধি লাভ করেন শরীয়তের ইসলাহ ও তাযকিয়ার শাস্ত্রে। তিনি ছিলেন জুনায়েদ আল-বাগদাদীর ওস্তাদ, এবং বিখ্যাত তাবেঈ হাসান আল বাসরির শাগরেদ। ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ সত্ত্বেও সাদাসিধা জিন্দেগী যাপন করার অনুপ্রেরনা পান তাঁর ওস্তাদ হাসান আল বাসরির কাছ থেকে। রাহিমাহুমুল্লাহ।

মাযহাবের ক্ষেত্রে তিনি ইমাম শাফেঈ এর ফিকহ অনুসরণ করতেন। তাঁর লিখিত কিতাবগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধ কিছু কিতাব হলো কিতাবুল খালওয়া, কিতাবুল রিয়’আ লি হুক্বুক্বিল্লাহ এবং কিতাবুল ওসাইয়া। তিনি ওফাত লাভ করেন ২৪৩ হিজরিতে।


ব্যাখ্যাকার পরিচিতি: তিনি প্রসিদ্ধ আবু গুদ্দাহ নামে, পুরো নাম আব্দুল ফাত্তাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে বাশির ইবনে হাসান আবু গুদ্দাহ আল-আনসারী। জন্মসূত্রে তিনি ইসলামের সিপাহসালার খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বংশীয় সন্তান। জন্ম সিরিয়া বা ব্রহত্তর শামের আলেপ্পোতে ১৯১৭ সালে, তিনি জীবনের শুরু থেকেই দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। অসংখ্য আলিম ও তালিবুল ইলমের ওস্তাদ হিসেবে পরিচিত এই মনীষী হানাফি ফিকহের একজন দক্ষ ফকীহ ছিলেন, এবং কুর’আন ও সুন্নাহকে কেন্দ্র করে নিজ জীবন পরিচালনা করেছিলেন। জীবনের একটা সময়য় তিনি আলেপ্পোর প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ওফাত লাভ করেন ১৯৯৭ সালে, ১৪১৭ হিজরিতে। 

তিনি যে কয়জন ওস্তাদের কাছ থেকে ইলম নিয়েছেন তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন, শায়খ মুস্তাফা যারকা, শায়খ মুহাম্মাদ নাজিব সিরাজুদ্দিন, এবং শায়খ আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-যারকা। রাহিমাহুমুল্লাহ।

পুরো জীবনে  তাঁর সহযোগী ছিলেন তাঁর স্ত্রী ফাতিমা আল-হাশেমী। ওফাতের সময় তিনি রেখে গেছেন তিন ছেলে ও আট মেয়ে। 

শায়খ আবু গুদ্দাহ এর জীবনী নিয়ে ওয়েবপেজ: http://www.aboghodda.com/Biography-Eng.htm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *