“এই মাস’আলায় মতপার্থক্য আছে!”

-মূল লেখক: ফাহাদ আল-আজলান, আবদুল্লাহ আল-উজাইরি

“এই মাস’আলায় মতপার্থক্য আছে!” – কথাটা হরহামেশাই শোনা যায়। অর্থের দিক থেকে তা শারিয়ার একটি সত্য বৈশিষ্ট্যকেই প্রকাশ করে বৈকি। ফিকহের সব বিধিবিধানের ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে ঐকমত্য নেই; বরং সেখানে যেমন সর্বসম্মত বিধান বিদ্যমান, তেমনি মতপার্থক্যপূর্ণ মাস’আলাও আছে। কারণ শারিয়ার সমস্ত নস [কুরআন-হাদিসের মূল বক্তব্য] মতপার্থক্যের-উর্ধ্ব অকাট্য নয়। দলিলসমূহের এই তারতম্যই ফকিহদের মতভেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি। আর ঠিক এ কারণেই মতের ভিন্নতা ও মাযহাবগুলোর উদ্ভব ঘটেছে। দলিল সাব্যস্ত করা ও বিশুদ্ধতা নির্ণয় এবং সেসব দলিলের দিক-নির্দেশনা বিবেচনা করার কাজ প্রত্যেকেই করার চেষ্টা করেছেন, আর এজন্য তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব কায়দাকানুন ও অগ্রাধিকার দানের মূলনীতি ছিল।

যুগ যুগ ধরেই মুসলিমরা ফিকহে বিদ্যমান এ মতপার্থক্য সম্পর্কে অবগত। এটা যেমন নতুন কিছু না, তেমনি এতে আশ্চর্য হওয়ারও কিছু নেই। যে কোনো মুসলিমই বুঝে যে, আলিমদের মধ্যে মতভেদ হয় এবং শারিয়ার সমস্ত বিধিবিধান অকাট্য ও ঐক্যমতপূর্ণ নয়। আর এ কারণেই ফিকহি মাযহাবগুলো সৃষ্টি হয়েছে এবং কালের পরিক্রমায় সেগুলো ইসলামি ভূখণ্ডগুলোতে বিস্তৃতি লাভ করেছে। এটাও জানা যে, সাধারণত প্রত্যেক অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট মাযহাব প্রভাব বিস্তার করে এবং সে অঞ্চলে ঐ মাযহাবের ফতোয়ার প্রচলন বেশি ঘটে। ঐ অঞ্চলে ঐ মাযহাব অনুযায়ীই সালিশ-বিচার করা হয়। তবে কোনো কোনো অঞ্চলে একাধিক মাযহাবও একসাথে প্রচলিত থাকতে পারে, এক্ষেত্রে একেক অঞ্চলের পরিস্থিতি একেক রকম।                  

সুতরাং “এই মাস’আলায় মতপার্থক্য আছে!” বক্তব্য দ্বারা এ জানা বিষয়ের উপর আলোকপাত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমরা এখানে যে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হলো – এই ফিকহি মতপার্থক্যের সাথে আমাদের আচরণ কেমন হবে। সাধারণত একজন বক্তা যখন এই বাক্যটি ব্যবহার করেন, তার উদ্দেশ্য থাকে এটা বুঝানো যে – একটি নির্দিষ্ট ফিকহি মত বা মাযহাবের রায়কে সবার জন্য আবশ্যক করে দেয়া এবং এই মতকে দ্বীনের অপরিহার্য অংশ বানিয়ে সে মত থেকে কারো বের হওয়াকে নাজায়েজ করে ফেলাটা কারো জন্য বৈধ নয়; যখন সে মতটি এমন একটি ইজতিহাদি মাস’আলায়, যেখানে মতভেদ করা অনুমোদিত। সুতরাং কিছুক্ষেত্রে মতের ভিন্নতা ও ইজতিহাদ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। এখানে আবশ্যক কাজটা হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী চেয়েছেন, সেটা খোঁজার চেষ্টা করা। অতএব এসব ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির পছন্দনীয় মতকে যিনি অপরপক্ষের উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তার সে মত কোনভাবেই তার বিরোধীর মতের চেয়ে উত্তম কিছু না। সুতরাং সে কখনই বলতে পারে না যে, তার মতটাই খোদ আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিপ্রায়।

অর্থাৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি, এ অর্থে উপরোক্ত বাক্যটি মোটের উপর সঠিক একটি কথা। আর মতভেদপূর্ণ মাস’আলায় যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরোধিতায়, এর প্রয়োগও সঠিক।

কিন্তু…কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা লঙ্ঘন করে, বাক্যটিকে ভুলভাবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন:

১) রুখসত [ছাড়] অনুসরণ করা:

এটা ঘটে তখনই – যখন কোনো ব্যক্তির উদ্দেশ্য থাকে প্রত্যেক মাস’আলায় সহজতম মতটা খুঁজে বের করার। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শারিয়ার বিধান কী, সেটা জানা বা ইলম ও দ্বীনদারিতায় বিশ্বস্ত এমন কাউকে প্রশ্ন করা নিয়ে তার মাথাব্যথা থাকে না। বরং সে চায়, কে তাকে রুখসতের ফতোয়া দেবে। আর যখন এরকম কোনো ফতোয়া পেয়েই যায়, সে প্রত্যেক মাস’আলায় সেটাকেই আঁকড়ে ধরে – তা সে মতের বক্তা ও ভিত্তি যেমনই হোক। একারণেই এমন ব্যক্তি যখন বলে – “এই মাস’আলায় মতপার্থক্য আছে!” সে শুধু এটাই চায় যে, ফিকহি মতভেদের সুযোগ নিয়ে সে তার পছন্দনীয় মতটাই বাছাই করে নেবে। আর নিঃসন্দেহে এটি মতভেদপূর্ণ মাস’আলার প্রতি ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। আলিমদের মধ্যে যত মতপার্থক্যই থাকুক, তারা সকলে এবিষয়ে একমত যে – এভাবে রুখসত অনুসরণ করাটা হারাম। কারণটা খুব স্পষ্ট, রুখসত খুঁজে খুঁজে সেগুলো অনুসরণ করার এই পদ্ধতি, ফিকহে ইজতিহাদ করার মূল যে চালিকাশক্তি অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিপ্রায় তালাশ করা – তার সম্পূর্ণ বিপরীত; এখানে বরং যা করা হচ্ছে সেটা হলো – নিজের নফস ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। আর এটি শারিয়া প্রেরণের মূল উদ্দেশ্যের সাথেই সাংঘর্ষিক। ইমাম আশ-শাতিবী বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন এভাবে:

“শারিয়া প্রবর্তনের উদ্দেশ্য হলো, মুকাল্লাফকে [দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি] তার প্রবৃত্তির আহ্বান থেকে বের করে আনা; যাতে সে যেমন অনিচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর দাস, তেমনি যেন স্বেচ্ছায়ও সে আল্লাহর একজন দাস হয়ে উঠতে পারে”। [1]

আর একারণেই সুলাইমান আত-তাইমি (রাহিমাহুল্লাহ) তার সে বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন: “তুমি যদি প্রত্যেক আলিমের রুখসতগুলো গ্রহণ করো, তোমার মাঝে সমস্ত মন্দের সম্মেলন ঘটবে”। ইবনু আব্দিল বার এই উক্তির উপর মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছেন: “এটি একটি সর্বসম্মত মত, আমার জানামতে এব্যাপারে কেউ মতভেদ করেনি”।[2]

আর আলিমদের বক্তব্যে একই অর্থ পাওয়া যাবে অগুনতিবার। আল-আওযায়ি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আলিমদের বিরল মতগুলো গ্রহণ করবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে”। [3] ইবরাহিম বিন আদহাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “তুমি যদি আলিমদের বিচ্ছিন্ন মতগুলো বহন করো, তুমি খুব নিকৃষ্ট বিষয় বহন করলে”[4] ইসমাইল বিন ইসহাক আল-কাদ্বি বলেছেন: “আমি আল-মু’তাদ্বিদের নিকট উপস্থিত হলে, তিনি আমার দিকে একটি বই এগিয়ে দিলেন। আমি বইটিতে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, তাতে আলিমদের পথস্খলন ঘটা রুখসত মতগুলো সব একত্রিত করা হয়েছে, প্রত্যেকেই সেখানে নিজের মন অনুযায়ী মতগুলো খুঁজে পাবে। আমি তাকে বললাম: ‘আমিরুল মু’মিনীন! এই বইয়ের সংকলক একজন যিনদীক [কপট ব্যক্তি]। তিনি বললেন: ‘এসব কি তবে অসত্য?’ আমি বললাম: ‘এখানে যা আছে, সেগুলো সত্য। কিন্তু যিনি নেশাকে বৈধতা দিয়েছেন, তিনি মু’তাকে বৈধ বলেননি। আর যিনি মু’তার বৈধতা দিয়েছেন, তিনি গানকে বৈধ বলেননি। এমন কোনো আলিম নেই, যার স্খলন ঘটেনি। যে ব্যক্তি আলিমদের এসব স্খলন একত্রিত করে গ্রহণ করবে, তার দ্বীন বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে না’। এরপর আল-মু’তাদ্বিদের নির্দেশে সেই বইটি পুড়িয়ে ফেলা হয়”।[5]

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া দরকার, যাতে তালগোল পাকিয়ে না যায়। রুখসত – পরিভাষাটি দুক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে পারে: শারিয়া প্রদত্ত রুখসত এবং ফকিহদের রুখসত। দুটোর মধ্যে পার্থক্য খুব স্পষ্ট। শারিয়ার রুখসত হলো সেসব বিধিবিধান, যেখানে কষ্ট বা জটিলতার কারণে কিছু সহজতা ও ছাড় প্রদান করা হয়েছে। যেমন, মুসাফিরের জন্য সালাত সংক্ষিপ্ত ও একত্রিত করা, অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রমাদানে রোজা ভঙ্গ করা, অতি জরুরী ক্ষেত্রে মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়ার অনুমতি, বলপ্রয়োগকৃত ব্যক্তির উপর থেকে দোষ উঠিয়ে নেয়া ইত্যাদি। এসবই শারিয়ার অকাট্য বা অনুমানমূলক বিধানের উদাহরণ, যা শারিয়া-প্রণেতাই দিয়েছেন। অন্যদিকে ফকিহদের রুখসত অনুসরণের অর্থ হলো, তাদের ইজতিহাদ ও পছন্দনীয় মতগুলো থেকে ছাড় অনুসন্ধান করা। এক্ষেত্রে সহজতম মতটি খুঁজে বের করার জন্য ফকিহদের মাযহাব ও বক্তব্যগুলোকে বিশৃঙ্খল ও অসংগতভাবে সংমিশ্রিত করে ফতোয়া তালাশ করা হয়। এখানে দলিল খোঁজার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হয় না, বরং মনোযোগ থাকে মনমত ফতোয়ার দিকে। এমনকি কখনও কখনও এমন হয় যে, কেউ দেখে কোনো স্খলন যদি খুঁজে পাওয়া যায়! যেখানে ছাড় পাওয়া যায়, সেটা গ্রহণ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এমন কাজ জ্ঞানগত দিক থেকেই পরস্পবিরোধী। কারণ যে ফকিহের কাছ থেকে রুখসত গ্রহণ করা হচ্ছে, তিনি যে দলিলের উপর ভিত্তি করে তা দিয়েছেন, হতে পারে সে দলিলটাই অন্য ফকিহের কাছ থেকে নেয়া অন্য একটি রুখসতের বিরুদ্ধে যায়। কিন্তু এসব তার ভাবনায় থাকে না। কারণ প্রথমত সে তো দলিলই খুঁজছে না! সে খুঁজছে হালকাতর ও সহজতম মত। এ থেকে বুঝা যায়, আলিমরা কেন এ ব্যাপারে এতটা কঠোরতা প্রদর্শন করেছেন।

২) যে কোনো মতভেদকেই ধর্তব্যে নেয়া:

অনেকে আবার আলিমদের কাছে না গিয়ে বা তাদের প্রশ্ন করা ব্যতিরেকেই, যে কোনো মতপার্থক্যকে গ্রহণ করার পক্ষে “এই মাস’আলায় মতপার্থক্য আছে!” – বক্তব্য ব্যবহার করে। এধরনের লোকেরা দুটি সুস্পষ্ট ভুলে পতিত হয়।

প্রথম ভুল: ধর্তব্য নয় এমন মতপার্থক্যকেও গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা। মতপার্থক্য আছে এমন সবকিছুই বিবেচনাযোগ্য নয়। যেমন ইজমা বা সুস্পষ্ট নস এর বিপরীতে গেলে, সে মত ধর্তব্যেই আনা যাবে না। সুতরাং সুস্পষ্ট কোনো শারঈ বিধানকে মতপার্থক্যের দোহাই দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা বৈধ নয়। আলিমদের কাছে মতপার্থক্য দুধরনের:

  • গ্রহণযোগ্য: যেসব ক্ষেত্রে দলিলের প্রশস্ততা রয়েছে এবং বিধানের সাথে সে দলিলের সামঞ্জস্যতার সম্ভাবনা আছে। এসব ক্ষেত্রে মতভেদের মাস’আলায় কোনো অকাট্য নস কিংবা পূর্বসংঘটিত ইজমা থাকতে পারবে না।
  • অগ্রহণযোগ্য: যেখানে নস বা ইজমার বিরোধিতা করা হয়েছে। এধরনের মত অনুসরণ বৈধ নয়।

আশ-শাফিঈ বলেছেন: “একজন বলল: ‘আমি অতীত ও বর্তমানের আলিমদের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য দেখতে পাই। এধরনের কোনো অবকাশ আছে?’ আমি তাকে বললাম: ‘মতভেদ দুধরনের হতে পারে; একটি হারাম, আর অন্যটির ব্যাপারে আমি তা বলি না’।”[6]

অর্থাৎ মাস’আলার মতপার্থক্য অগ্রহণযোগ্যও হতে পারে। সুতরাং কেউ হয়ত এমন মতপার্থক্যকে ধর্তব্যে আনছে, যা গ্রহণযোগ্যই নয়। একারণে আপনি দেখতে পাবেন, সুস্পষ্ট নস এর বিপরীতে বিচ্ছিন্ন, পরিত্যাক্ত অথবা দূর্বল সব মত উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি ত্রুটিপূর্ণ। একজন মুসলিমের উপর আবশ্যক হলো, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য অনুসরণ করবে। সুতরাং শুধুমাত্র মতপার্থক্যের অস্তিত্ব এ আবশ্যকীয় দায়িত্ব পালন করার পথে কোনো প্রতিবন্ধক হতে পারে না; আর সে মত যদি হয় বিচ্ছিন্ন বা দূর্বল, তাহলে তো কথাই নেই।

দ্বিতীয় ভুল: যেসব মাস’আলায় আসলে মতভেদই নেই, সেসব ক্ষেত্রেও মতপার্থক্য আছে মনে করা। এটা হতে পারে, মতপার্থক্যের প্রকৃত অবস্থা এবং তৎসংশ্লিষ্ট শর্ত, বাধা ইত্যাদি সম্পর্কে ব্যক্তির অজ্ঞতা। কিছু কিছু মাস’আলা হয়ত নির্দিষ্ট অবস্থা বা শর্তের ভিত্তিতে বা প্রতিবন্ধকতার অনুপস্থিতির সাথে সংশ্লিষ্ট; এসব বিষয়ে সব মানুষের পারদর্শিতা নেই। এক্ষেত্রে মাস’আলার ধরন অনুযায়ী আলিম খুঁজে নিতে হবে। সুতরাং যেকোনো মতপার্থক্য পেলেই যারা তা আঁকড়ে ধরে, তাদের ক্ষেত্রে বিপরীত কোনো মত দেখলেই তা তুচ্ছজ্ঞান করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

৩) খোদ মতভেদকেই প্রমান মনে করা:

অনেকে আছে, কুর’আন ও সুন্নাহর বক্তব্য পরিত্যাগ দেয়ার সপক্ষে “মতপার্থক্য আছে” বক্তব্য দ্বারা যুক্তি দেয় এবং তারা স্বয়ং মতপার্থক্যকেই দলিল হিসেবে গণ্য করে বসে! যেন দলিল অনুসরণের ক্ষেত্রে ঐকমত্য থাকাটা একটি শর্ত আর কী! আলিমদের মধ্যে একজনও এ কথা বলেননি যে, দলিল অনুযায়ী আমল করতে হলে তা সর্বসম্মত হতে হবে। বরং তারা একমত, যখনই কারো কাছে কোনো দলিল থেকে স্পষ্ট হবে যে এটাই শারিয়ার অভীষ্ট, সে তা মেনে চলতে বাধ্য। আলিমদের মতপার্থক্য হলো, এই অভীষ্ট উদ্দেশ্যটুকুর ব্যাপারে; কোনো দলিলের উপর ঐকমত্য পৌঁছানো পর্যন্ত আমল না করার ব্যাপারে নয়! সুতরাং আবশ্যক হলো, দলিলের অনুসরণ করা এবং সব মতভেদকে সে অনুযায়ী বিচার করা, উল্টোটা না!

ইমাম ইবন হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “মূলকথা হলো, এরকম কোনো মত আজ পর্যন্ত কেউ দেয়নি যে, ইজমা না হওয়া পর্যন্ত কেউ নস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করবে না। বরং ইজমা তো এর উপর হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি জেনে বুঝে যদি একথা বলে; নস যার আনুগত্যের ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই, তার বিরোধিতা করার কারণে সে একজন কাফির”।[7]

আর একারণেই, গ্রহণযোগ্য মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তির করণীয় সম্পর্কে আলিমগণ মতভেদ করেছেন, সে মুজতাহিদ হোক বা মুকাল্লিদ। তাদের প্রত্যেকেই দলিল অনুসরণের ব্যাপারে একমত। কিন্তু মতপার্থক্য ঘটে গেলে, একজন সাধারণ মানুষ ও মুজতাহিদ করবে কী? এবিষয়ে তাদের মতভেদেই বলে দিচ্ছে, তারা দলিলের অনুসরণ ও স্বয়ং মতপার্থক্যকে প্রমাণ হিসেবে ধর্তব্যে না নেয়ার ব্যাপারে একমত। বরং তাদের চিন্তার বিষয় হলো, মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে করণীয় হিসেবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নিয়ে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি যদি মুজতাহিদ আলিম হয়ে থাকেন, তিনি শারিয়ার দলিল থেকে সঠিক মতটি খুঁজে বের করার জন্য তার সক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন। এতটুকু করতে পারলেই, তিনি সঠিক মতে পৌঁছান বা ভুল করুন, তিনি পুরস্কৃত হবেন। তিনি সঠিক হলে দুটি পুরস্কার, আর ভুল করলে একটি পুরস্কারের অধিকারী হবেন এবং তার ভুলও ক্ষমা করে দেয়া হবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন কোনো বিচারক বিচার করতে গিয়ে ইজতিহাদ করে, সে সঠিক হলে তার জন্য দুটি পুরস্কার। আর যদি সে বিচার করতে গিয়ে ভুল করে, তার জন্য একটি পুরস্কার”।[8]

আর ব্যক্তি যদি সাধারণ মানুষ হয়, তার উপর আবশ্যক হলো, ফতোয়ার জন্য একজন যোগ্য আলিম খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এরপর প্রবৃত্তির আহ্বানের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে তার প্রশ্নটি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা যেন তা সত্য গ্রহণের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে মতভেদের সম্মুখীন হলে, সে তার জন্য প্রযোজ্য শারঈ পদ্ধতির শরণাপন্ন হবে। ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) এবিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন: “যদি তাকে দুই বা ততোধিক মুফতি ভিন্ন ফতোয়া দেয়, সে কি সবচেয়ে কঠিন মতটি গ্রহণ করবে, নাকি সবচেয়ে সহজটি, নাকি সে পছন্দমত বাছাই করে নেবে, নাকি সবচেয়ে জ্ঞানী মুফতির মতটি গ্রহণ করবে, নাকি সবচেয়ে ধার্মিক জনের মতটি, নাকি সে তৃতীয় আরেকজন মুফতির কাছে প্রশ্ন করবে এবং প্রথম দুজনের মধ্যে যার সাথে তা মিলবে সে অনুযায়ী আমল করবে, নাকি তার কর্তব্য হলো সক্ষমতা অনুযায়ী সঠিক মতটি খুঁজে বের বেরা? এই সাতটি অভিমতের মধ্যে, সঠিক হলো সপ্তম মতটি। অর্থাৎ সে দুটি পথ, দুজন চিকিৎসক বা দুজন পথনির্দেশকের ভিন্নতার ক্ষেত্রে যা করে, এখানেও সেটাই করবে”। [9]

আর খোদ মতপার্থক্যকেই প্রমাণ মনে করার পরিণতি হলো, কিছু কিছু লোক এখন বিশ্বাস করে যে, কোনো মাস’আলায় মতভেদ থাকার অর্থ হলো, তা করা বৈধ! সে যে কোনো মাস’আলায় যখন শোনে এক্ষেত্রে মতপার্থক্য আছে, সে মনে করে এই কাজটি করার বৈধতা আছে। ইমাম আশ-শাতিবী (রাহিমাহুল্লাহ) বহু আগেই এব্যাপারে অভিযোগ করে গেছেন: “আর এবিষয়টি সীমা ছাড়িয়ে এমন স্থানে পৌঁছে গেছে যে, কোনো মাস’আলায় মতপার্থক্য থাকাটাকে বৈধতার সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে আর আলিমদের মধ্যকার মতভেদের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় অনেক কিছুর বৈধতা দেয়ার ঘটনা ঘটছে”। এরপর তিনি এই পদ্ধতির ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন: “শারিয়ায় নিঃসন্দেহে এটি ভুল; যেহেতু এক্ষেত্রে যা নির্ভর করার মত নয়, তাকে নির্ভরতার স্থান এবং যা প্রমাণ নয়, তাকে প্রমাণ বানানো হচ্ছে”।[10]

শারিয়া ও ইজমার সাথে এই পদ্ধতির বিরোধ বর্ণনা করে ইবন তাইমিয়্যা বলেন: “কোনো কিছুর হারাম হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধ হওয়ার পরও, হয় সেটি হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হতে পারে অথবা পারে না। যদি মতবিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে হারাম সাব্যস্ত না হয়, তাহলে যেসব বিষয়ে হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য ঘটেনি সেরকম কোনো কিছুকেই আর হারাম বলা যাবে না এবং যত বিষয়ে মতপার্থক্য ঘটবে, সেগুলোর সবগুলোকেই হালাল বলতে হবে! আর এমন কথা উম্মাহর ইজমা বিরোধী। আর এ পদ্ধতির অসারতা দ্বীন ইসলামের আবশ্যকীয় জ্ঞান থেকেই স্পষ্ট”[11]

৪) এধরনের পরিস্থিতিতে ব্যক্তির উপর আবশ্যকীয় শারঈ দায়িত্বের প্রতি অবহেলা:

যখন একজন মুসলিম যে কোনো ফিকহি মাস’আলার সম্মুখীন হওয়া মাত্রই “মতপার্থক্য আছে” শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে, একসময় তার অবস্থা এমন হবে যে, বিধান পালনের ক্ষেত্রে সে দূর্বল হয়ে পড়বে এবং হারাম কাজগুলোকে ছোট করে দেখা ও সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে গড়িমসি শুরু করবে। কারণ একদিকে সে মতপার্থক্যকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করার ব্যাপারে নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে, অন্যদিকে সে মতভেদের প্রকৃত অবস্থা ও দলিল সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না। এর ফলাফল হয়ে দাঁড়ায়, তার উপর যে আবশ্যকীয় শারঈ দায়িত্ব ছিল, তা সে পালনে ব্যর্থ হবে, আর তা হলো:

  • এধরনের মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে সঠিক মতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা চালানো। আবশ্যক হলো, সত্য খুঁজে বের করা ও মহান আল্লাহর ইচ্ছা পূরণ করা। নিজের প্রবৃত্তির খায়েশ মেটানো ও মনমত আমল করা বা মতপার্থক্যের অস্তিত্বের ধুয়া তুলে এ আবশ্যকীয় দায়িত্বকে ছুড়ে ফেলা না।
  •  এধরনের মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অবস্থা ও জ্ঞান অনুযায়ী তারজিহ [অগ্রাধিকার] দেয়ার সঠিক শারঈ পদ্ধতি অনুসরণ করা, যেমনটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন কেউ কেউ বলতে পারে: কিন্তু মতভেদপূর্ণ মাস’আলায় তো অন্যপক্ষকে তিরস্কার করা যাবে না।

হ্যাঁ, সত্য যে, এটি একটি গ্রহণযোগ্য শারঈ মূলনীতি। কিন্তু এটি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন সে মতপার্থক্য হবে এমন ইজতিহাদি মাস’আলায় যেখানে মতভেদ করা গ্রহণযোগ্য। অকাট্য দলিল বা ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত মাস’আলার ক্ষেত্রে যে মতভেদ করবে, অবশ্যই তার তিরস্কার করা হবে।

ইমাম ইবন তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ) এই মূলনীতি বিষয়ে খুব সুন্দর আলোচনা করেছেন, যেখানে তিনি মতভেদপূর্ণ মাস’আলায় কোনটি তিরস্কারযোগ্য নয় এবং সে তিরস্কারের ধরন কেমন হবে তা ব্যাখ্যা করেছেন। এই মূলনীতি নিয়ে কথা বলে এমন বেশিরভাগ লোকই একথাগুলো মাথায় রাখে না।

তিনি বলেছেন: “মতভেদপূর্ণ মাস’আলায় অন্যপক্ষকে তিরস্কার করা যাবে না – কথাটি শুদ্ধ নয়। সমালোচনা কখনও হতে পারে কোনো বক্তব্যের অথবা হতে পারে আমলের। যদি কোনো বক্তব্য সুন্নাহ বা সাব্যস্ত ইজমার বিরোধী হয়, তার তিরস্কার করা সর্বসম্মতিক্রমে অত্যাবশ্যক। আর যদি তা নাও হয়, সেক্ষেত্রেও তিরস্কার করা হবে, অর্থাৎ এক্ষেত্রে তার বক্তব্যের দূর্বল দিক তুলে ধরা হবে, সালাফ ও ফকিহদের অধিকাংশই এ মত পোষণ করতেন যাদের কাছে ইজতিহাদের সঠিক ফলাফল একক। আর আমলের ক্ষেত্রে, যদি তা সুন্নাহ বা ইজমার বিরোধী হয়, সেক্ষেত্রে তার তিরস্কার করা অত্যাবশ্যক। তবে এ সমালোচনার স্তরে তারতম্য ঘটবে, যেমনটা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি মতভেদপূর্ণ নাবিজ পানের আলোচনায়; এবং যেমনিভাবে সুন্নাহর বিরুদ্ধে গেলে বিচারকের রায়কেও খণ্ডন করা হয়, কিছু আলিম তা মেনে নিলেও

আর যদি কোনো মাস’আলায় সুন্নাহ বা ইজমা না থাকে এবং সে মাস’আলায় ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য হয়, সেক্ষেত্রে যে ব্যক্তি মুজতাহিদ বা মুকাল্লিদ হিসেবে তার উপর আমল করবে, তাকে তিরস্কার করা হবে না। এ সংশয় সৃষ্টির কারণ হলো, এ বক্তা ভেবেছে মতভেদপূর্ণ মাস’আলা মানেই হচ্ছে ইজতিহাদযোগ্য মাস’আলা, যেমনটা কিছু লোক বিশ্বাস করে। কিন্তু সঠিক হচ্ছে তা, যার উপর ইমামরা ছিলেন যে, ইজতিহাদযোগ্য মাস’আলা হলো সেগুলো- যেক্ষেত্রে এমন কোনো দলিল নেই যার উপর আমল করা স্পষ্টত আবশ্যক, যেমন এমন কোনো বিশুদ্ধ হাদিস যার কোনো সমপর্যায়ের বিপরীত দলিল নেই, এসব ক্ষেত্রে তার জন্য ইজতিহাদ করা গ্রহণযোগ্য – কাছাকাছি দলিলসমূহের সাংঘর্ষিকতা বা সুপ্ততার কারণে। আর কোনো মাস’আলাকে অকাট্য বলা হলেই এর বিরোধিতাকারী মুজতাহিদগণ অপবাদযোগ্য হয়ে যান না, যেমন সালাফগণ যেসব মাস’আলায় মতভেদ করেছেন”।[12]

কিছু লোকের কাছে সমালোচনা যেন জমাটবদ্ধ এক জড়বস্ত, যার কোনো তারতম্য হতে পারে না। ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ) এখানে এমন অপধারণার উঁচুমানের জ্ঞানীসুলভ সমাধান দিয়েছেন। বরং সঠিক হলো- সমালোচনারও স্তর আছে, যা কিছু বিষয়ের উপর নির্ভরশীল:

  • সমালোচনা হবে জ্ঞানের ভিত্তিতে। কোনো মাস’আলার ধরন ও তাতে অগ্রাধিকারপূর্ণ মত জ্ঞানের দিক থেকে যত শক্তিশালী হবে, সেক্ষেত্রে সমালোচনাও তীব্র হবে। আর যত তা হ্রাস পাবে, সমালোচনাও কম হবে। একারণেই আপনি দেখতে পাবেন, কোনো কোনো মাস’আলায় সালাফদের কেউ কেউ তীব্র সমালোচনা করেছেন, অথচ পরবর্তী যুগের কারো চোখে হয়ত সে মাস’আলায় মতভেদ গ্রহণযোগ্য। এর কারণ ঐ ইমামের কাছে সেটি তেমন ছিল না। আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, মাস’আলার বর্ণনা ও এর অকাট্যতার ক্ষেত্রে কিছুটা আপেক্ষিকতা থাকতে পারে। আর খোদ সমালোচনাও জ্ঞানের ভিত্তিতে তীব্র বা লঘু হতে পারে। অকাট্য বিষয়ের ক্ষেত্রে তা যেমন অপনোদন, নিষেধ ও তীব্র তিরস্কার হতে পারে, তেমনি এর চেয়ে কম পর্যায়ের বিষয়ে তা হতে পারে শুধুমাত্র ভুল ধরিয়ে দেয়া, সদুপদেশ ও ইলমি আলোচনার ভিত্তিতে।
  • যার সমালোচনা করা হচ্ছে, তার অবস্থা বিবেচনা করা। একজন আন্তরিক সত্যান্বেষীর ক্ষেত্রে সমালোচনার সময় তার প্রতি সদয় ও বিনম্র আচরণ করা হবে। অন্যদিকে যার ক্ষেত্রে প্রবৃত্তি-পূজা ও সত্যবিমুখতার আচরণ বিভিন্ন আনুষঙ্গিকতা থেকে স্পষ্ট হয়ে পড়ে, তার ক্ষেত্রে সমালোচনার তীব্রতাও যথাযোগ্য হওয়া চাই।
  • জনসাধারণের অবস্থা ও তাদের প্রতিক্রিয়ার প্রতি খেয়াল রাখা। যেমন, খোদ মাস’আলা বা এর সমালোচনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক অনুভূতি ও সমালোচনা পরবর্তী এর ভালো-মন্দ প্রভাব ইত্যাদি।  

মূলকথা হলো, অকাট্য ও অনুমানমূলক মাস’আলার সমালোচনার ক্ষেত্রে তারতম্য রয়েছে যেমনটা শাইখুল ইসলাম ইঙ্গিত করেছেন। আর তা মাসলাহা-মাফসাদার বিভিন্ন বিবেচ্য দিক মাথায় রেখে নির্ধারিত হবে। এটি কোনো কঠিন জড় অবস্থা নয় যে, সর্বাবস্থায় প্রত্যেক মাস’আলায় প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা একই রকম হতে হবে।

এক্ষেত্রে কেউ কেউ আপত্তি তুলে বলতে পারে: অজ্ঞ লোক বা যার কাছে এর কোনো ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে, এমন ব্যক্তির তিরস্কার কীভাবে ঠিক হতে পারে, যখন তার উপর থেকে পাপ তুলে নেয়া হয়েছে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে তিরস্কার ও পাপ আরোপকরণের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারার মধ্যে। এদুটো এক নয়। কাউকে পাপী সাব্যস্ত করা ও দোষারোপ করার চেয়ে সমালোচনা ও সদুপদেশ দানের ক্ষেত্র অনেক বেশি প্রশস্ত। সুতরাং যারা নিজস্ব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে কোনো স্পষ্ট নস এর বিরোধিতা করে তাদের সমালোচনা করা হবে, যদিও হয়তবা তারা সুমহান আল্লাহর কাছে ক্ষমাযোগ্য। অতএব তিরস্কারের সাথে পাপ আরোপকরণের কোনো আবশ্যকীয়তা নেই। তিরস্কারের সম্পর্ক হলো মাস’আলার সাথে। আর ক্ষমার সম্পর্ক হলো তার ইজতিহাদ ও নিয়তের সাথে। “আর আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের উর্ধ্বে কোনো কিছু চাপিয়ে দেন না” [আল-বাকারা ২৮৬]।

পুরো লেখার সার নির্যাস হলো: শারিয়াতে মতপার্থক্য একটি গ্রহণযোগ্য বিষয়। এটি তো শারিয়ার প্রশস্ততা যে, ইজতিহাদযোগ্য ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মত মেনে চলার জন্য তা কাউকে বাধ্য করে না। মুসলিম শুধুমাত্র সতর্ক থাকবে, মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলোতে এমন কিছু ভুল পথপদ্ধতি যেন সে অবলম্বন না করে, যা তার উপর শারিয়া কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালনে কমতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।


মূল: যুখরুফুল কওল; অধ্যায় ৬ (আল-মাস’আলা ফিহা খিলাফ)

ছবির সূত্র: Brendan ChurchUnsplash

ফুটনোট:

[1] আল-মুওয়াফাকাত; আশ-শাতিবী (২/২৮৯)

[2] জামিউ বায়ানিল ইলম ও ফাদ্বলিহি; ইবনু আব্দিল বার (২/১৮৫)

[3] সিয়ার ‘আলাম আন-নুবালা (৭/১২৫)

[4] আল-জামি লি আখলাক আর-রাওয়ি ওয়া আদাব আস-সামিঈ; আল-খাতিব আল-বাগদাদি (২/১৬০) 

[5] আস-সুনান আল-কুবরা; আল-বাইহাকি (২০৯২১)

[6] আর-রিসালাহ; আশ-শাফিঈ (৫৬০)

[7] আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম; ইবন হাযম (৩/৩৬৭)

[8] বুখারি ও মুসলিম

[9] ইলামুল মুয়াক্কিঈন; ইবনুল কায়্যিম (৬/২০৫)

[10] আল-মুওয়াফাকাত; আশ-শাতিবী (৫/৯৩-৯৬)

[11] রফউল মালাম আনিল আঈম্মাতিল আলাম; ইবন তাইমিয়্যা (৬৩)

[12] আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা; ইবন তাইমিয়্যা (৬/৯৬)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *