উসমানি সাম্রাজ্যে নারী

মূল লেখক: জারা হুদা ফারিস

“পুরুষের তুলনায় বেশি না হলেও অনেক নারীকে রাস্তা-ঘাটে দেখা যেত […]। আমি মনে করি, কখনো আমি তুর্কির মত দেশ দেখিনি যেখানে নারীরা এত বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে যেখানে কোনো অপবাদ ও ভর্তসনার সম্মুখীন তাঁরা হয় না  […]। আমাদের লিঙ্গের প্রতি তুর্কিদের যে মনোভাব তা অন্যান্য সকল জাতির কাছে একটা উদাহরণ। […] এবং আমি আবারও বলছি, আমি মনে করি কোন নারীই তুর্কি নারীদের মত এত বেশি স্বাধীন ও বাধামুক্ত নয়। তাদের জীবন-যাপনের ধরন দেখে আমার মনে হয়, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী প্রাণী।”

– Lady Elizabeth Craven, A Journey Through the Crimea to Constantinople, 1789 [i]

১৮শ শতাব্দীর ভ্রমণ-রচয়িতা, নাট্যকার, এবং লেখিকা লেডি এলিজাবেথ ক্র্যাভেন ১৭৮৯ সালে উসমানি খেলাফতের (ইসলামি রাস্ট্র) নারীদের নিয়ে এমনই মন্তব্য করেছিলেন। এটা ইউরোপে নারীবাদের আবির্ভাবেরও পূর্বে। এমনকি মেরি ওলস্টোনক্রাফটের “A Vindication of the Rights of Woman” (1792) প্রকাশের ৩ বছর পূর্বে।

তিনশো’ পৃষ্ঠার এই আবেদন আধুনিক নারীবাদের ভিত্তিপ্রস্তর ও অগ্রদূত হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। লেডি এলিজাবেথ ক্র্যাভেন ও অন্যান্যদের পর্যবেক্ষণের সাথে কোর্টের রেকর্ড, অর্থনৈতিক লেনদেন ও রাজনৈতিক নথিগুলো এমনই প্রমাণ বহন করে যে, উসমানি খিলাফতের নারীরা নারীবাদের প্রয়োজন ছাড়াই উত্তর-আলোকায়নের (post enlightenment) পশ্চিমা নারীদের থেকে অনেক বেশি স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা পেত। তা সত্ত্বেও, বর্তমানে নারীবাদীরা মুসলিম নারীদের এর একদম বিপরীত চিত্র বোঝানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে যে মুসলিম নারীদের সবসময় ইসলামের জন্যই ভুগতে হয়েছে। পাশাপাশি ঘুরিয়ে পেচিয়ে উদ্ভটভাবে প্রচার করছে যে নারীবাদ হলো মুসলিম বিশ্বের সমস্যা সমাধান এর উপায়।

এই লেখাটিতে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত টিকে থাকা ইসলামের এক খেলাফতের (উসমানি) অধীনে বাস করা নারীদের অবস্থার পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের পরিস্থিতিকে পশ্চিমে নারীবাদের উত্থান ঘটানো পরিস্থিতির সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেমন আমরা দেখবো উসমানি খিলাফতের অনেক সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত এটাই প্রমাণ করে যে, ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম বিশ্বের নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কখনোই নারীবাদের প্রয়োজন ছিল না। বরং মূলত তাদের  দরকার ছিল তাদের নিজেদের বিশ্বাসের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন- তা হল ইসলাম।

মুসলিম দেশ বনাম ইসলামি রাস্ট্র:

কোনো তুলনায় যাবার আগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো মুসলিম রাষ্ট্র ও ইসলামি রাষ্ট্রের মৌলিক পার্থক্যগুলোক তুলে ধরা। উসমানি খেলাফত ছিল একটি ইসলামি রাষ্ট্র, অর্থাৎ শরীয়ত (ইসলামের পবিত্র বিধি-বিধান) সেখানে আইনের একমাত্র উৎস হিসেবে সর্বোচ্চ স্তরে (supreme) ছিল। এই সাম্রাজ্য বিংশ শতাব্দিতে সমাপ্তির আগ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ বছর টিকে ছিল। শরিয়াহ উসমানিদের নিত্যদিনের ব্যক্তিগত এবং প্রকাশ্য বিষয়াদি, যেমন- ব্যক্তিগত, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনগত কাঠামো দিয়েছিল। এছাড়াও, এই শরিয়াহ উসমানি খিলাফাতের মধ্যে আফ্রিকা, ইউরোপ, এবং এশিয়ার নারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল এবং নিরাপত্তা দিয়েছিল, যার মধ্যে আছে ইহুদি, খ্রিস্টান, মুসলিম, আনাতোলিয়ান, গ্রীক, উত্তর আফ্রিকান, পশ্চিমা এশিয়ান, এবং বালকান উপদ্বীপের নারীরা।

কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, তুর্কি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মত মুসলিম দেশগুলো হল ধর্মনিরপেক্ষ ও অনৈসলামিক। অর্থাৎ, এই দেশগুলোর সংবিধান মনে করে ইসলাম কেবল পোস্ট-এনলাইটেনমেন্ট এর অনেকগুলো আইনের উৎসের একটি মাত্র। পক্ষান্তরে, এই দেশগুলো হল ধর্মনিরপেক্ষ, দুর্নীতিবাজ, জালেম। ইসলাম পালনের উদাহরণ হিসেবে এগুলোকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই মুসলিম দেশগুলোর সাধারণ মুসলিম পুরুষ ও নারীরা স্বাধীনতা লাভ করবে ।

আইনগত অবস্থা:

পশ্চিমে নারীরা বিয়ের মাধ্যমে তাদের নিজেদের আইনগত পরিচয় (এবং নিজেদের নাম) হারিয়ে বসত, ফলে সে না পারতো কাউকে আদালতে অভিযুক্ত করতে, না কেউ তাকে অভিযুক্ত করতে পারত। স্বামীদেরকে তাদের পক্ষ হয়ে অভিযোগ করতে হত বা অভিযোগের সম্মুখীন হতে হতো।

ইংল্যান্ডসহ বেশিরভাগ ইংরেজি ভাষী কলোনিগুলোতে coverture বা দায়িত্বের তত্ত্ব অনুযায়ী নারীদের চিহ্নিত করত। একজন বিবাহিত মহিলার তার স্বামী-ভিন্ন নিজের কোনো আলাদা আইনগত পরিচয় ছিল না। বিয়ের মাধ্যমে তার সবকিছুই স্বামীর পরিচয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত এবং তাকে feme covert (বিবাহিত বা আক্ষরিকভাবে আবৃত নারী) হিসেবে বিবেচনা করা হত। এই আইনি বিষয়টি ১২ শতক থেকে ১৯ শতকের মাঝ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল (প্রায় উসমানি খেলাফতের পূর্ণ সময়কালের সমসাময়িক)।

“বিয়ের মাধ্যমে স্বামী এবং স্ত্রী আইন অনুযায়ী একজন মানুষ হিসেবে গণ্য হয়; তার মানে একজন নারী স্বয়ং বা তাঁর আইনগত অস্তিত্ব বিয়ের মাধ্যমে স্থগিত হয়ে যায়, অথবা কমপক্ষে তা তার স্বামীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়- যার তত্ত্বাবধানে, নিরাপত্তায় এবং আবরণে একজন নারী সবকিছু পালন করে … “

– William Blackstone, 18th century English jurist and judge, explaining coverture [ii]

Coverture দু’দিক থেকে যন্ত্রণাদায়ক, যা নারী ও পুরুষ উভয়ের জীবনকেই বাঁধাগ্রস্ত করছিল। স্ত্রীদের স্বাধীন ইচ্ছা অস্বীকার করার মাধ্যমে তাদের দায়বদ্ধতাও অস্বীকার করা হচ্ছিল। উদাহরণস্বরুপ, একজন নারী তার নিজের নামে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারত না এবং তার স্বামীকে তার পক্ষ থেকে কাজগুলো করা লাগত। এর মানে আরও হচ্ছে, কেউ যদি কোনো বিবাহিতা নারীর ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নিতে চায়, তাহলে তার স্বামীকে তার জায়গায় অভিযুক্ত করা হবে। ইংরেজি সাহিত্যের মধ্যেই নারীর থেকে এভাবে দায়বদ্ধতা তুলে নিয়ে তা তার স্বামীর হাতে সোপর্দ করার বিষয়টি বিদ্রুপ করে তুলে ধরা হয়েছিল। চার্লস ডিকেন্সের ওলিভার টুইস্টে  মিঃ বাম্বেলকে বলা হয় “আইন তোমাকে আদেশ দিচ্ছে যে তোমার স্ত্রী যেন তোমার দিকনির্দেশনায় চলে”, যেটার উত্তরে মিঃ বাম্বেল বলেন,”যদি আইন তা আদেশ করে থাকে […] আইন হল নিরেট গর্দভ। যদি এটাই আইনের চোখ হয়, তাহলে আইন হল অপরিপক্ক, এবং সবচেয়ে বাজে যে আশা আমি করি তা হল- যেন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই যেন আইনের চোখ খুলে।” [iii]

Coverture কেবল শুধু নাগরিক আইন-এর জন্যই ছিল, অপরাধ কর্মকান্ডের জন্য নয়। কারণ আমরা জানি, এমনকি ১৭৮৪ সালেও, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকার কলোনিগুলোতে তখনও যাদু-টোনা এবং বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে নারীদের পুড়িয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটত। [iv], যদিও Coverture কেবল নাগরিক আইন-এর সাথে সম্পর্কিত ছিল, একটি কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, সাম্প্রতিক ১৯৭২ সালে আমেরিকার দুটো প্রদেশে একজন ফৌজদারি আদালতে অভিযুক্ত স্ত্রীকে “স্বামীর আদেশ মেনে অপরাধ করাকে” আত্মপক্ষ সমর্থন হিসেবে পেশ করার অনুমতি দিয়েছিল![v]

অন্যদিকে, উসমানি খেলাফতে নারীদের বিবাহিত-অবিবাহিত উভয় অবস্থাতেই আলাদা আইনি পরিচয় ছিল, যার কারণে এমনকি অমুসলিম উসমানি নারীরাও নিজ আদালতের তুলনায় ইসলামিক আদালতকে বেশি পছন্দ করতো।

উসমানি খেলাফতে ছেলেদের মত নারীদেরকেও বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হবার পরপরই রাষ্ট্রে আলাদাভাবে গণ্য করা হত, ইসলামি আইন অনুযায়ী তাদের নিজস্ব আইনি পরিচয়ও ছিল। এই আইনি মর্যাদা বিবাহিত বা অবিবাহিত উভয়ের জন্যই ছিল।[vi] তাছাড়াও, মুসলিম নারীরা নিজস্ব পরিচয় ও দায়বদ্ধতার স্মারক (reminder) হিসেবে বিবাহের পরেও বংশগত নাম ধরে রাখতে পারত।  

পুরুষের পাশাপাশি, নারীর বৃহৎ পরিসরে আইনি অধিকার ছিল, যেমনঃ কাজীর সামনে (ইসলামিক বিচারক) স্বাধীনভাবে নালিশ করা এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের মতো ব্যাপক আইনি অধিকার পেত। এই অধিকারের জন্য তাদের সাথে তাদের কোন সহচারী পুরুষের প্রয়োজন হত না। এমনকি প্রয়োজনে তারা নিজেদের স্বামী বা অন্য কোন পুরুষ আত্মীয়ের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতো । গ্রাম থেকে শহরে- যেকোনো সামাজিক শ্রেণির উসমানি নারীরা তাদের স্বার্থ রক্ষার করার জন্য ইসলামিক আদালত ব্যবহার করত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিচারকগণ নারীদের আইনি এবং সম্পত্তির অধিকারের পক্ষে থাকতেন।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলামিক কাজীর আদালতকে নারীদের সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এতটাই অনুকূলে ভাবা হত যে, অমুসলিম উসমানি নারীরা প্রায়ই ইসলামিক কাজির আদালত ব্যবহার করতো, যদিও উসমানি খেলাফতের আশ্রয়ে প্রতিটা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যধারা পরিচালনা করবার অনুমতি ছিল। প্রতিটা ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের নিজেদের ভিতরের ব্যাপার একজন উচ্চপদের ধর্মীয় নেতার মাধ্যমে পরিচালনা করবার মত সাংস্কৃতিক ও আইনি কর্তৃত্ব উপভোগ করতো।

অর্থনৈতিক কর্মকান্ড: [১]

বিয়ের পর পশ্চিমের নারীদের নিজস্ব সম্পদের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না; তাদের স্বামীর উপর দায়িত্ব ছিল তাদের রক্ষণাবেক্ষণের এমনকি তারা তাদের স্ত্রীর দেনা মেটাতে বাধ্য ছিল।

Coverture তত্ত্ব অনুযায়ী যেহেতু স্বামী এবং স্ত্রীকে ‘এক ব্যাক্তি’ ধরা হয়, তাই স্ত্রীর তার নিজের সম্পত্তির উপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। স্বামী তার সম্পদ স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া ব্যবহার ও হস্তান্তর করতে পারত (যদি না বিয়ের সময় ভিন্ন কোন চুক্তি থেকে থাকে।)

এছাড়াও একজন স্ত্রী কোনো কোন চুক্তিতে অংশ নিতে পারত না। ১৯ শতকে, যখন কোন স্ত্রী তার সম্পদ হস্তান্তর করত (যখন তার স্বামী অনুমতি দিতো), তখন সেই সম্পদ হস্তান্তর বা ব্যবহারের আগে একটি তদন্তের ব্যবস্থা ছিল । সেখানে তাকে একজন বিচারকের সামনে (স্বামীর অনুপস্থিতিতে) আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হত এই বিষয় জানার জন্য যে তার স্বামী তাকে দলিল সই করানোর জন্য কোন জোর জবরদস্তি করেছিল কিনা। এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল বিবাহিত মহিলাদের সম্পদ রক্ষা করার একটি মাধ্যম হিসেবে ।

অপরপক্ষে, যেহেতু তারা আইনের চোখে একক ব্যক্তি, স্বামী আইনের মাধ্যমে তার স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে বাধ্য, সে স্ত্রীর জন্য ঠিক ততটুকুই খরচ করবে ঠিক যেমন সে নিজের জন্য করে। এমন যদি হতো যে একজন স্ত্রী দেনা নিয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, অথবা তার নিজের জন্য ধার নেয়, তাহলে তার পরিবর্তে তার স্বামী দেনাদার হয়ে যাবে এবং তাকেই দেনা পরিশোধ করতে হবে, স্ত্রীকে দেনা পরিশোধে বাধ্য থাকতো না।

ব্রিটেনে এই নিয়মটি Married Women’s Property Act of 1870 পাস হবার আগ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। পরবর্তী এই আইন পুরানো আইনকে বদলিয়ে একজন স্ত্রীকে মালিক হবার, কেনা ও বেচার, অভিযুক্ত করা ও হবার, এবং নিজের দেনার জন্য দায়ী হবার অধিকার দেয়।

অন্যদিকে, উসমানি খেলাফতের নারীরা সবসময়ই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন এবং এতই সক্রিয় ছিল যে কিছু কারখানায়, সংস্থাগুলো (সেই সময়ে কারিগর এবং বণিকদের একটি সংস্থা) নারীদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করতো।

“তুর্কি স্ত্রীকে দাসি এবং অস্থাবর সম্পত্তি বলা হয়েছে। কিন্তু সে এর কোনটিই নয়। বাস্তব পক্ষে, আইনগতভাবে তাঁর অবস্থান ইউরোপের বেশিরভাগ স্ত্রীর থেকেই উত্তম এবং সাম্প্রতিক কালের আইন জারির আগ পর্যন্ত, তুর্কিদের তুলনায় ইংরেজরা নিজেদের স্ত্রীকে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে দেখতো। কারণ তুর্কি নারীরা সবসময় তাদের সম্পদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করতে পারত। আইন তাকে স্বাধীনভাবে তার মালিকানায় থাকার ও যে কোন কিছু ব্যবহার ও হস্তান্তর করার সুযোগ দিত, বিয়ের সময়ে বা পরে যখনই সে ঐ জিনিসের মালিক হোক না কেন। জীবিত থাকা অবস্থায় সে চাইলে এই সম্পদ বিলাতে পারে অথবা তার যাকে ইচ্ছা তাকে এই সম্পদের মালিক বানাতে পারে। আইনের চোখে সে একজন স্বাধীন সত্ত্বা, তাই সে স্বামীর অনুপস্থিতিতে  মামলার বাদী বা বিবাদী হতে পারতো। এই বিষয়গুলোর প্রেক্ষিতে তুর্কি নারীরা তাদের খ্রিস্টান বোনদের থেকে বেশি স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে।“

– Z. Duckett Ferriman, 1911

উসমানি খেলাফাতে নারীদের যেসব ইসলামী অধিকার দেওয়া হত, তার মধ্যে রয়েছে বাবা ও স্বামীর অনুমতি ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছায় সম্পদের উত্তরাধিকার হওয়া, মালিক হওয়া, নিয়ন্ত্রণ করা এবং হস্তান্তর করা। অন্যভাবে বলতে উসমানি নারীরা আইনি ভাবে তাদের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করার অনুমতি পেত, আর তারা তা প্রয়োগও করতো।

প্রকৃতপক্ষে উসমানী অর্থনীতিতে নারীরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। জমির মালিক, সামরিক জায়গীরের মালিক, খাতক, ঋণদাতা, বেসরকারি কর সংগ্রাহক, ও ব্যবসায়ের অংশীদার হবার মত ভূমিকায় তারা অংশগ্রহণ করত। বিভিন্ন শ্রেণীর উসমানী নারীরা বাজারে ব্যবসা ও লেনদেন করতে পারাটা উসমানী আমলে খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। [ix]

বিভিন্ন দলিল থেকে জানা যায় যে, উচ্চবংশের উসমানী নারীরা (যারা মূলত বাইরের জগতে কম বের হত) সাধারণভাবে পুরুষের সাথে লেনদেন করত না। বিদেশী পর্যবেক্ষকরা তা দেখে মনে করলো যে নারীরা জোরের মুখে পুরুষ কর্মচারী ও দালাল নিয়োগ করছে। এই মনোভাবের কারনে কিছু পর্যবেক্ষক এক অদ্ভুত সহানুভূতি দেখিয়ে মায়াকান্না করতে লাগলো, যেন উচ্চবংশের নারীরা কোন না কোনভাবে জুলুমের স্বীকার হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী। এমনকি শুরু থেকেই তারা বাজারের বেশিরভাগ দোকানের মালিক ছিল, এমন দলিলও পাওয়া যায়। [x] আসলেই তারা কতই দুর্ভাগা যে তাদের ব্যবসা দেখার জন্য কর্মচারী ঠিক করা লাগত! এছাড়াও এই উচ্চবংশের মহিলারা মৌলিক কিছু স্থাপত্য প্রকল্পে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে আলাদা একটা প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

তাছাড়া উসমানী খিলাফতের নারীরা কারুশিল্প, রেশম এবং তুলা বুননের কাজে জড়িত ছিল। মসুলে তুলার সুতা তৈরি একটি শিল্পে রূপান্তরিত হয়, যা ব্যাপকভাবে ঘরের মধ্যেই খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে চর্চা হত। এক সময় এই শিল্পে মহিলাদের এমন একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয় যে তুলা বোনার সংস্থাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে এই একাধিপত্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন! [xi]

উসমানী নারীরা সম্পদ দানের ক্ষেত্রে এক মৌলিক  ভূমিকা পালন করে। ১৮ শতকের সময় সব শ্রেণির উসমানী নারীরা রাষ্ট্রের ২০-৩০% দাতব্য সংস্থা গড়ে তোলেন (ওয়াকফ করেন)। স্কুল, হাসপাতাল, পান্থশালা, গোসলখানা, লঙ্গরখানা, ঝর্ণা, হোস্টেল এবং মসজিদ এই সবই পুরো রাজ্য জুড়ে মানব সেবার উদ্দেশ্যে নারীর নিজস্ব সম্পদ থেকেই নারীদের দ্বারা আর্থিকভাবে পরিচালিত হত।

রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার:

১৯২৮ সালের পূর্বে ব্রিটেনে পুরুষ ও নারীর সর্বজনীন ভোটাধিকার অর্জিত হয়নি। [২]

ব্রিটেনে শুধুমাত্র একটি স্তরের ধনী পুরুষরা ভোট দিতে পারতো। যার ফলে অধিকাংশ পুরুষ ও সকল নারীরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হত! ১৯১৮ সালের পর ২১ বছরের ঊর্ধ্বে সকল পুরুষ ও ৩০ এর উর্ধে সকল নারীরা ভোটাধিকার পায় এবং ১৯২৮ সালের পর ২১ বছরের ঊর্ধ্বে সকল পুরুষ ও নারীরা ভোটাধিকার পায়।

অন্যদিকে উসমানি খেলাফতের পুরুষ ও নারীর রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় থাকার প্রয়োজন ছিল।

উসমানি খেলাফতের অধীনে পুরুষদের মত নারীদেরও সরাসরি ডিভানে আবেদন করার সমানাধিকার ছিল। যে পরিষদে উজিররা রাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক করতো তাকে “ডিভান” বলা হত। নারী ও পুরুষ উভয়েরই উসমানি খেলাফতের প্রতি আনুগত্যের বায়াত দেবার অধিকার ছিল।

পুরুষদের থেকে নারীদের সামাজিক পৃথকীকরণ মূলত উচ্চ শ্রেণির পরিবারের মধ্যেই বেশি দেখা যেত। অন্যদিকে নিচু শ্রেণীর নারীরা সাধারণত চলাফেরার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীন ছিল অর্থনৈতিক কাজে তাদের অংশগ্রহণের কারণে। [xii]

যেমন ইউরোপীয় বিদেশীদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ছিল এই যে উচ্চ বংশের নারীরা অবশ্যই নিপীড়িত এবং গণ্ডিবদ্ধ। বাস্তবে, ১৬ শতকের শেষের দিকে উসমানী খেলাফত আসলে “নারীদের সালতানাত” হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন সুলতানদের মায়েরা ও অন্যান্য রাজকীয় মহিলারা হারেমের পর্দার আড়াল থেকেই ক্রমবর্ধিতভাবে ক্ষমতাবান এবং প্রভাবশালী হয়ে উঠলো। যদিও হারেম কখনোই ইসলামিক ধারণা ছিল না, বরং নারীদের সালতানাত জোরালো প্রমাণ দিচ্ছে কেবলমাত্র পর্দার ভিতর থাকলেই সমাজে তাদের ভূমিকা গণ্ডিবদ্ধ নয়।

সামাজিক জীবন:

পশ্চিমে পুরুষ ও মহিলা কারোরই তালাক নেওয়ার অধিকার ছিল না। যদি তারা আইনগত ভাবে বিচ্ছেদ করতে পারার মত যথেষ্ট ধনী হত, তাহলেও পরে নতুন করে বিবাহ করা ছিল মৃত্যুদণ্ডের শামিল।

১৮৫৭ সালে Matrimonial Causes Act এর আগ পর্যন্ত ইংলিশ আইনে তালাক দেওয়া বেআইনি ছিল। ১৮৫৭ সালের পূর্বে কেবল জটিল পদ্ধতির মাধ্যমে অথবা সংসদে Private Act এর অধীনে (যেখানে দম্পতির সাংসারিক বিষয় নিয়ে জনসম্মুখে তর্ক বিতর্ক হত) আইনি বিচ্ছেদ অর্জন করা যেত । উভয় পদ্ধতিই খুব ব্যয়বহুল ছিল, আর তাই আইনি বিচ্ছেদ কেবল ধনীদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল।

শুধু তাই নয়, স্বামী স্ত্রী যারা আলাদা হয়েছে, তাদের পুনরায় বিয়ে করা নিষিদ্ধ ছিল। ‘দ্বিপত্নীকরণ’ গীর্জার দ্বারা প্রথমে নিষিদ্ধ ও অভিযুক্ত করার আওতায় আনা হয়, এবং ১৬০৪ সালে তা আইনিভাবে একটি গুরুতর অপরাধ সাব্যস্ত করা হয় যার শাস্তি মৃত্যুদন্ড! [xiv]

অন্যদিকে উসমানি খেলাফতে বহুবিবাহ ছিল দুর্লভ। শেষ পদক্ষেপ হিসেবে নারী পুরুষ উভয়ের দ্বারা তালাক  হয়ে থাকতো।

“ তুর্কিরা দেশ শাসন করে এবং তাদের নারীরা তাদের শাসন করে। তুর্কি নারীরা অন্যদের চাইতে অনেক বেশি বিভিন্ন জায়গায় যেত এবং উপভোগ করত। বহুবিবাহ ছিল অনুপস্থিত। যারা অবশ্যই চেষ্টা করেছিল, তবে ছেড়ে দিয়েছিল কারণ তা বেশি খরচ ও সমস্যার সৃষ্টি করে।

– Saomon Schweigger, German Protestant minister who travelled to the Ottoman Empire at the end of the 16th century.

বিয়ে-শাদির ব্যবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পিতা-মাতা এবং পরিবারের মাধ্যমে করা হত, যা উসমানি সমাজে পরিবারের গুরুত্বের উপর জোর দেয়। উসমানি নারীদের পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করবার অধিকার ছিল এবং বিবাহপূর্ব চুক্তি বিরল ছিল না। বহুবিবাহ ইসলামের আইনানুযায়ি অনুমোদন ছিল, কিন্তু এর বাস্তব উদাহরণ খুব কম ছিল, কারন প্রায় ৯৫% এর বেশি পুরুষের একজন স্ত্রীই ছিল। [xv]

উসমানি বিচারক বিবাহিত যুগলদের অধিকারকে হুবহু একই হিসেবে না দেখে পরিপূরক হিসেবে দেখত।“[xvi] উদাহরণস্বরূপ, উসমানি খিলাফতে একজন বিবাহিত নারীকে তাঁর নিজ সম্মতিতে বিয়ে করা স্বামীর আনুগত্য করতে হত– যদি না সে তাকে কোন খারাপ বা হারাম কাজ করতে বলে। তবে, নারীদের আইনি মর্যাদা, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাজকর্ম পরিষ্কারভাবে দেখায় যে মুসলিম পুরুষরা তাদের স্ত্রীদের প্রতি বাড়তি বোঝা প্রয়োগ ও জুলুম করত না। তাছাড়া, যেহেতু আইনের চোখে পুরুষরা নারী ও শিশুদের অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিতে বাধ্য ছিল, তাই পুরুষদের তালাক দেওয়ার পদ্ধতি মহিলাদের তুলনায় আলাদা ছিল- তবে তালাকের অধিকার উভয়েরই ছিল। প্রকৃতপক্ষে, উসমানি খিলাফাতে নারীদের অনাকাঙ্ক্ষিত বিবাহ শেষ করা (তালাক) বেশ সহজ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৮ শতকে ইস্তানবুলে মহিলাদের দ্বারা বিচ্ছেদ, বাতিলকরণ এবং তালাকের হার এত বেশি ছিল যে, সমাজের পর্যবেক্ষকদের চোখে তা এক বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ব্যাপারটা কেবল দুইজন মানুষের পরিবর্তে দুই পরিবারের মিলন হবার কারণে তালাক যে পক্ষ থেকেই হত, সেটা পীড়াদায়ক হতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও, তালাক স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই একটা বৈধ উপায় ছিল। [xvii]

যেকোন পক্ষ থেকে বৈধ তালাকের কারণগুলো হল – সাংসারিক অসামঞ্জস্যতা (incompatibility), অর্থনৈতিক সমস্যা যা দম্পতিদের মাঝে বিবাদের দিকে নিত, শারীরিক নিপীড়নসহ অন্যান্য দূর্ব্যবহার, ব্যভিচার, যেকোনো পক্ষ বিয়ের মৌলিক প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়া, বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর পরিবারের জন্যে প্রয়োজনীয় কাজ না করা। কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীরা স্বামীর বাড়িতে থাকতে অসন্তুষ্ট থাকার কারণে তালাক দিত, অথবা স্ত্রী পুত্র জন্ম না দিলে স্বামী তালাক দিত [৩]। [xviii]

তালাকের পর পুরুষ এবং নারী উভয়েরই পুনরায় বিয়ে করার পূর্ণ অধিকার ছিল। অমুসলিম উসমানি নারী যাদের ধর্ম ও ঐতিহ্য তাদের পুনরায় বিয়ে করবার অনুমতি দিত না- ইসলাম গ্রহণ তাদের জন্যে অসুখী বিবাহ থেকে মুক্তি পাবার সাধারণ বা কমন পদ্ধতি ছিল।

মুসলিম নারীদের কি নারীবাদের প্রয়োজন আছে?

আমরা দেখতে পাচ্ছি, খোদাপ্রদত্ত অধিকার অর্জন করার জন্য উসমানি খেলাফতের মুসলিম নারীদের নারীবাদের প্রয়োজনই পড়ত না। । উসমানি খেলাফত কেবল মুসলিম পুরুষ এবং নারীর অধিকার বাস্তবায়ন ও রক্ষাই করেনি, বরং তারা তাদের অধীনে বাস করা বড়সংখ্যক এবং বিভিন্ন দলের অমুসলিম নারীদের জায়গা করে দিয়েছিল। এই বিষয়টির দিকে জোর দেওয়া উচিত যে, পশ্চিমে নারীবাদ আবির্ভাবের বহু পূর্ব থেকেই নারী ও পুরুষের মধ্যে এমন সুবিচার এবং সমৃদ্ধি চলে আসছিল এবং সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত তা জারি ছিল (বিংশ শতাব্দির শুরুর দিক পর্যন্ত)। পশ্চিমা পোস্ট এনলাইটেনমেন্ট এর মহিলাদের বিপরীতে মুসলিম নারীদের কখনই সুবিচার এবং অধিকার নিশ্চিত করতে নারীবাদের মত জোড়াতালি (patch-work) ও লিঙ্গ-পক্ষপাতী মতবাদ প্রয়োজন হয়নি। এই ব্যাপারে ইসলামি খিলাফাত তাদের নিশ্চয়তা দিয়েছে। মনে হতেই পারে যে, পশ্চিমা নারীরা হতাশা ও ক্ষোভ থেকেই নারীবাদ তৈরি করেছে, কারণ তাদের কাছে ইসলাম ছিল না। তাই এখন আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে, যদি মুসলিম নারীর অধিকারের জন্য ইসলামই যথেষ্ট হয়, তাহলে তাদের কি আদৌ নারীবাদের প্রয়োজন আছে? থাকলে কেন? 


মূল লেখা: Ottoman Women During the Advent of Western Feminism | Zara Faris

ছবিটির সূত্র: A Turkish Letter-writer, at Constantinople – Allom Thomas [1836-38] (Also accessible here)

রেফারেন্স-

[i] Elizabeth Craven (Baroness), A Journey Through the Crimea to Constantinople: In a Series of Letters from the Right Honourable Elizabeth Lady Craven to His Serene Highness The Margrave of Brandebourg, Anspach, and Bareith, London.

[ii] William Blackstone, Commentaries on the Laws of England (Vol. 1, 1765, pages 442-445)

[iii] Charles Dickens, Oliver Twist, 1838, chapter 51

[iv] http://www.capitalpunishmentuk.org/burning.html

[v]The Law: Up from Coverture, Time Magazine, published Monday, March 20, 1972, accessed at http://www.time.com/time/magazine/article/0,9171,942533,00.html

[vi] Jenie R. Ebeling, Lynda Garland, Guity Nashat, Eric R. Dursteler “West Asia” The Oxford Encyclopedia of Women in World History. Ed Bonnie G. Smith. Oxford University Press, 2008. Brigham Young University (BYU). 1 November 2010

[vii] Ebeling, Garland, Nashat, and Dursteler

[viii] Colin Imber, The Ottoman Empire, 1300-1650: The Structure of Power, New York: Palgrave Macmillan, 2002

[ix] Mehrdad Kia, Daily Life in The Ottoman Empire, Greenwood, 2011

[x] Kia, M.

[xi] Ebeling, Garland, Nashat, and Dursteler

[xii] Ibid.

[xiii] Ibid.

[xiv] Bernard Capp, Bigamous Marriage in Early Modern England, University of Warwick, 2009

[xv] Ebeling, Garland, Nashat, and Dursteler

[xvi] Kia, M.

[xvii] Ebeling, Garland, Nashat, and Dursteler

[xviii] Justin McCarthy, The Ottoman Turks: An Introductory History to 1923 (London, New York: Wesley Longman Limited, 1997)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *