অনুসরণীয় আদর্শ

মূল লেখক: শায়খ আহমাদ আস-সায়্যিদ

নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে প্রকট সমস্যাগুলোর একটি হলো, তাদের সামনে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও অনুসরণীয় আদর্শের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি। “আমরা কাকে অনুসরণ করব? কার বক্তব্য মেনে নেবো? কার কথা শুনব?”

মানব প্রকৃতি তার স্বভাব অনুযায়ীই অনুকরণপ্রিয়। আদেশ-নিষেধের তাত্ত্বিকতা তার সামনে কেউ বাস্তবায়ন করে দেখাক, এটাই সে পছন্দ করে। সে দেখতে চায় – কোনো জীবিত আস্ত একজন মানুষ এই কাজগুলো বাস্তব পৃথিবীতেই করে দেখাচ্ছে। একারণেই সাহাবিগণ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম), আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও অনুকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। কারণ তারা নিজেদের চোখের সামনেই তাঁর বিভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। এবং এর মাধ্যমে তারা অর্জন করেছেন ইমান, ইয়াকিন ও দৃঢ়তার অগ্রগণ্য স্তর। “তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ”।[1]

কিন্তু আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, মানুষকে যারা দিকনির্দেশনা দেয়, চিন্তাভাবনা ও জীবন পদ্ধতি সম্পর্কে কথা বলে, তাদের নিয়েই আমরা এক মহা সঙ্কটের মধ্যে পড়েছি। উন্মুক্ত ইন্টারনেট ও ওয়েবসাইটগুলো সবার জন্য বক্তৃতার মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে যে কেউই নিজ নিজ ধ্যানধারণার প্রতি মানুষকে আহ্বান করতে সক্ষম। বিশেষত এখন সময়টাও এমন যে এসব ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশেরই বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাদক্ষতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

সমস্যা আরো প্রকট হয়েছে, যখন একদিকে যেমন ইলম বহনকারী ও প্রচারকারী কিছু আলিম ও দাঈর কাজেকর্মে ইলমের যথাযথ রূপ প্রতিফলিত হয়নি। অন্যদিকে তাদের অনুসারীদের ভাষা, আচরণ ও আলোচনার বিষয়বস্তুর পরিবর্তনের বিশালতা তাদের অনেকেই বুঝে উঠতে পারেননি।

এর সাথে যোগ করুন, সুযোগসন্ধানী সেসব লোকদের সমস্যা, যারা আলিম-দায়ীদের অডিও-ভিডিও বা লেখায় ভুলত্রুটি ধরার জন্য ঘাপটি মেরে বসে থাকে। অথবা তারা হয়তো ঠিকই বলেছিলেন, কিন্তু তা এডিট করে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু যে ব্যক্তি আক্রোশ থেকে তা করা হয় এমন নয়, বরং পুরো দাওয়াহ ও দ্বীনদারিতাকেই অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। আবার কখনও হয়তো স্বয়ং ইসলামের প্রতি আক্রোশ স্বরূপ তা করা হয়, যেমনটা নাস্তিকেরা করে, যাদের কাজই হলো জল ঘোলা করে মাছ শিকারের চেষ্টা করা।

খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ হলো, এক্ষেত্রে আমাদের একটি নিয়ম মেনে চলতে হবে। সেটি হচ্ছে: অবশ্যই নীতিকে ব্যক্তির উপর স্থান দিতে হবে।

সুতরাং যদি কোনো আলিমের পা পিছলে যায় বা তিনি বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দেন, দোষারোপ করতে হলে তাকে করা হবে; দ্বীন বা যে ইলম তিনি বহন করছেন, তার দিকে আঙ্গুল তোলা যাবে না। বরং মানুষ তাকে এটা বলতে পারে যে, আপনার দ্বীন আপনাকে এমন একটা কাজ করতে বাধা দিল না?! আপনার জ্ঞান আপনাকে রক্ষা করতে পারল না?!

তাদের দৃষ্টান্ত সে ব্যক্তির মত যে প্রজ্ঞা পরিপন্থী কোনো কাজ করলে, তাকে বলা হয়: তোমার বিবেকে বাঁধল না?! তুমি একবার চিন্তা করে দেখলে না?!

কিন্তু আজ মূলনীতি যেহেতু দূর্বল হয়ে পড়েছে, আলিমের ভুলত্রুটি ও বিভ্রান্তি আর তার একার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বেশিরভাগ মানুষ খোদ দ্বীনকেই দুষছে। এ এক মহা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে! যা অকল্যাণ ও ফিতনার দরজাকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে।

একারণেই আবশ্যক হলো মানুষের ধ্যানধারণা ও সংস্কৃতির পিরামিডটাকে উল্টে দেয়া। এটা প্রতিষ্ঠিত করা যে, নীতিকে ব্যক্তির উপর স্থান দিতে হবে। তাদের বুঝানো যে, ফিতনায় পড়েছেন বা প্রবৃত্তির অনুসারী বা ত্রুটিপূর্ণ ও বিভ্রান্ত এমন ব্যক্তির সংখ্যাই কম।

ইসলামি শারিয়া ও আলিমদের তুরাসে এই মূলনীতি খুব স্পষ্টভাবেই প্রতিষ্ঠিত। আলিমদের মধ্যে তারতম্য ও তার যথাযথ হক আদায়কারীদের ব্যাপারে যেখানে প্রচুর বক্তব্য পাওয়া যাবে। যেসব আলিম ইলমের যথাযথ হক আদায় করেছেন; তাদের তারা সম্মান দিয়েছেন, দ্বীনের ইমাম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে যারা তা আদায় করেননি, তাদের নিন্দা করেছেন। প্রত্যেকের সাথে তার কর্ম অনুযায়ী আচরণ করা হয়েছে।

ইউরোপিয়ান এনলাইটমেন্ট ও রেনেসাঁর যুগে সেখানকার সমাজগুলো যে ধর্মকে ছুঁড়ে ফেলেছিল, এই বিষয়টি তার অন্যতম প্রভাবক ছিল। প্রথম প্রথম ধর্মগুরুদের অবস্থানকে মানুষের চোখে খাটো করে তোলা হয়েছিল। এরপর একসময় পুরো ধর্মকেই খাটো করে দেখান হয়। এর সহায়ক ছিল একদল ধর্মগুরু ও পাদ্রীদের বিভিন্ন অপকর্ম এবং বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পেছনে তাদের উস্কানি, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা ইত্যাদি।

ঠিক তার বিপরীতে, দ্বীনের উপর দৃঢ়তা, জীবনযাত্রায় ভারসাম্য বজায় রাখা ও নীতি-আদর্শ মেনে চলতে পারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হলো – বাড়িতে, আত্মীয়স্বজন, এলাকা ও আশেপাশে এমন কিছু আলিম ও সৎকর্মশীল অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি যারা নিজেদের বিশ্বাসকে কাজে বাস্তবায়ন করে দেখান।

অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের গুণাবলী:

অনুকরণীয় আদর্শের ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম যেসব প্রশ্ন নিয়ে অস্থিরতার মধ্যে আছে: “আমরা কাকে অনুসরণ করব? কার বক্তব্য মেনে নেবো? কার কথা শুনব?”। কাকে অনুসরণ করা উচিত আর কাকে করা উচিত না, এদুয়ের মধ্যে পার্থক্যকারী বৈশিষ্ট্যগুলো যদি স্পষ্ট হয়, সেখানেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে।

আমি আটটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব। আশা করি, তাতে এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে বা নিদেনপক্ষে তার কাছাকাছি নিয়ে যাবে। তবে তার আগে আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই:

প্রথমত: কোনো আদর্শ ব্যক্তিত্বই নির্ভুল বা নিষ্পাপ নন। বরং তার পদস্খলন ঘটতে পারে। তিনি ভুল করতে পারেন। এমনকি তার দ্বারা পাপও সংঘটিত হতে পারে। সুতরাং এক-দুটি পাপের কারণে কাউকে অনুসরণযোগ্যের স্থান থেকে পদচ্যূত করা উচিত নয়। যদি না – তিনি নিজের পাপকে প্রকাশ্যে প্রচার করা, সেটা নিয়ে গর্ব করা বা তা ত্যাগ করতে অস্বীকার করার মত পর্যায়ে পৌঁছে যান। সার্বিকভাবে এধরনের মানুষ কখনও আদর্শপুরুষ হতে পারেন না। হয়তো আংশিকভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার উত্তম দিকগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যে ব্যভিচারী নারী একটি কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল, নির্দিষ্টভাবে এই আমলটির ক্ষেত্রে [অর্থাৎ তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করানো] তার অনুসরণ করা যাবে।

দ্বিতীয়ত: যে গুণগুলো আমি উল্লেখ করব, অনুসরণযোগ্য হতে হলে তার প্রত্যেকটিই পরিপূর্ণ রূপে কোনো ব্যক্তির মধ্যে উপস্থিত থাকতে হবে, এমন না। যদিও এর প্রত্যেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কারো মধ্যে যদি এর বেশিরভাগ উপস্থিত থাকে। মোটের উপর বলা যেতে পারে যে, তিনি অনুসরণযোগ্য। একইসাথে মনে রাখতে হবে, “অনুসরণ” এর বিভিন্ন স্তর ও প্রকার রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক স্তর বা প্রকারের জন্যই, সবগুলো গুণ তার মধ্যে থাকা শর্ত নয়।

গুণাবলী আলোচনার পর আমি অনুসরণের মাপকাঠিগুলোও উল্লেখ করব ইন শা আল্লাহ।

প্রথম গুণ: উৎস হিসেবে স্পষ্টদ্ব্যর্থহীন [মুহকামাত] বিষয়গুলোকে গ্রহণ করা

যথার্থ অনুসরণীয় আদর্শ হওয়ার জন্য যে বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: স্পষ্ট দ্ব্যর্থহীন বিষয়গুলোর উপর নির্ভর করা, অস্পষ্টতার উপর নয়। মৌলিক বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে শাখাগত বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত দেয়া, উল্টোটা নয়। একমাত্র এ পদ্ধতিতেই জীবনকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা ও সুষ্ঠু জ্ঞান অর্জন সম্ভব। কোনো ব্যক্তি তখনই হতবুদ্ধি হয়, পথ হারায় বা তার পদস্খলন ঘটে, যখন তার মূলনীতি ও উৎস ঠিক না থাকে। অর্থাৎ এটি অনেকটা ট্রেনের জন্য তার লাইনের মত, যা তার গতিপথ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং যাত্রাপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

অতএব, যারা শুধুমাত্র অস্পষ্ট বিষয়গুলোর পেছনে পড়ে থাকে; বিপরীতক্রমে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয় না। বরং স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিষয়গুলোকে অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক বিষয়গুলোকে বুঝার মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ না করে সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তোলে – কোনোভাবেই তাদের অনুসরণ করা যাবে না। “আর যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারাই ফিতনার উদ্দেশ্যে ও (তাদের পছন্দমত) ব্যাখ্যা অনুসন্ধানের জন্য, দ্ব্যর্থবোধক অংশের পেছনে লেগে থাকে”।[2]

দ্বিতীয় গুণ: শারিয়ার মূলপাঠ [নস] এবং উদ্দেশ্য ও কল্যাণের [মাকাসিদ ও মাসলাহা] মধ্যে সমন্বয় সাধন

প্রায়শই ‘নস’ এর পক্ষ অবলম্বনকারীদের সাথে ‘মাকাসিদ আশ-শারিয়া’র পক্ষ নেয়া দলের যুদ্ধ বেঁধে যায়। প্রথম দলের অভিযোগ – ওরা উদ্দেশ্য ও জনকল্যাণের নামে দ্বীন ও শারিয়াকে বিকৃত করে ফেলছে। আর দ্বিতীয় দলের অভিযোগ – মূলপাঠের অনুসারীরা দ্বীনকে স্থবির বানিয়ে রেখেছে এবং তারা মানুষের চাহিদা ও ইসলামের স্পিরিট থেকে দূরে অবস্থান করছে।

আমাদের দুটোর প্রতিই খেয়াল রাখতে হবে। শারিয়া কখনোই নস ও মাকাসিদকে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে নিয়ে যায় না। বরং উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে বলে। অর্থাৎ একজন ফিকহ বিশেষজ্ঞের জন্য শারিয়ার মূলপাঠ হলো, কোনো বিধানের পেছনে শারিয়ার উদ্দেশ্য খোঁজার ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক স্বরূপ। অন্যদিকে মাকাসিদ হলো দিগন্তের মত; মূলপাঠ অধ্যয়নের সময় ফকিহ যার প্রতি দৃষ্টি রাখেন।

এই ভারসাম্য স্থাপনের ফলস্বরূপ আমরা পাই ‘ফিকহ’ – যা দুটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গঠিত:

১। স্পষ্ট ও অকাট্য বিষয়গুলোর সাথে শারিয়ার মূলপাঠের সমন্বয়তা

২। বাস্তবতার প্রতি গুরুত্ব প্রদান; এবং শারিয়ার সাধারণ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়, বাস্তবতার সাথে এমন ন্যায্য আচরণ

তৃতীয় গুণ: সতর্ক মনোভাব ও বাস্তবতাকে ভালোভাবে বুঝতে পারা

অনুসরণীয় আদর্শের স্থানে পৌঁছানোর জন্য যে গুণটি অবশ্যই থাকতে হবে, সেটা হলো – মানুষ ও বাস্তবতাকে বুঝতে পারার দক্ষতা। কা’বাকে তার আদিরূপে – তথা ইসমাইল আলাইহিস সালামের যুগে তা যেমন ছিল – ফিরিয়ে নেয়ার কল্যাণের (মাসলাহা) উপরে, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জাতির সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী লোকেদের ধর্মত্যাগের অকল্যাণ (মাফসাদা) রোধ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তাদের প্রভাবিত হওয়ার মাফসাদাটি ছিল – কাবাকে পুনর্নিমার্ণ করার জন্য আগে সেটাকে ভাঙ্গতে হবে। এতে যে ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে, তার আভাস রাসুলুল্লাহ আঁচ করতে পেরেছিলেন। মানুষের মনোভাব ও তাদের জীবনযাত্রার স্তরগুলোর ব্যাপারে তাঁর সতর্ক পর্যবেক্ষণ থাকার কারণে, এই মাফসাদাটি রোধ করাকে তিনি মাসলাহা অর্জনের উপরে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

একইভাবে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যখন মুনাফিকদের সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাইকে হত্যা করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, যাতে কেউ একথা বলতে না পারে: মুহাম্মাদ তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করে। এক্ষেত্রেও তিনি সর্বনিকৃষ্টতম মুনাফিকের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার মাসলাহার উপরে, ফিতনা সৃষ্টি হওয়ার মাফসাদা রোধ করাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

চতুর্থ গুণ: ব্যক্তি স্বার্থের উপর উম্মাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া

ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হতে পারবেন না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তিনি মুসলিমদের স্বার্থকে অন্য যে কোনো ছোটখাট স্বার্থের উপর প্রাধান্য দিচ্ছেন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও শারিয়ায় এটি খুব স্পষ্ট ও পরিস্কারভাবেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এক দল লোকের উপর নিজেদের প্রবৃত্তি ও ব্যক্তিগত স্বার্থ এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে যে, তাদের শারঈ জ্ঞান ও দাওয়াতি কাজের মধ্যেও তার অনুপ্রবেশ ঘটেছে।

এধরনের কিছু দৃষ্টান্ত আমি নিজ চোখেই দেখেছি। উদাহরণস্বরূপ: আমি হাদিস শাস্ত্রের এমন একজন বিশেষজ্ঞকে চিনি, যিনি নিজ বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ ও পারদর্শী। দ্বীনের আবশ্যকীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় উত্থাপনের এই যুগে, তার এই জ্ঞান ও দক্ষতাকে তিনি সুন্নাহ, এর প্রামাণিকতা এবং ইলমুল হাদিসের প্রতি উত্থাপিত বিভিন্ন সংশয়ের খন্ডন ও জবাব দেয়ার কাজে লাগাতে পারতেন। যেহেতু তার নিজস্ব দক্ষতার ক্ষেত্রই হলো হাদিস শাস্ত্র। কিন্তু তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, অন্য যেসব দাঈদের তার সাথে ‘মানহাজ’ এর ক্ষেত্রে ভিন্ন মত পোষণ করে তাদের সাথে তর্কবিতর্কে। এক সময় অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছুল যে, তিনি সবকিছুর ব্যাপারেই তাদের বিরোধিতা করতে শুরু করলেন, তা যথার্থ হোক বা না হোক।

আমার ধারণা এর শুরুর ভিত্তিটা ছিল, “ভুল সংশোধন” এর মূলনীতি। কিন্তু এই মূলনীতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে শয়তানের পাতা বিপদজনক ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।

পঞ্চম গুণ: কথা ও কাজের মিল

ইসলাম কোনো তাত্ত্বিক দর্শনের নাম নয়। কোনো অবস্থাতেই এর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। সুতরাং যে ব্যক্তি শুধু মুখের কথা ও বাহ্যিক বেশভূষা নিয়েই আড়ম্বর দেখাবে, আর তার কাজকর্ম হবে কথার বিপরীত; সে আর যা-ই হোক, আদর্শপুরুষ হতে পারে না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু দাঈ খুব বিশ্রী ধরনের পরস্পরবিরোধিতায় লিপ্ত, তার নিয়ত ভালো বা খারাপ যা-ই হোক। ইসলামি দাওয়াতের শত্রুদের কাছে যারা হাসি-তামাশার পাত্রে পরিণত হয়েছে। একদল তরুণতরুণী যারা এক সময় তাদের মহান, নিষ্কলুষ ও নিজেদের আদর্শ মনে করত। এরপর হঠাৎ একদিন যখন তারা প্রভাববিস্তারকারী বা কঠিন কোনো পরিস্থিতিতে রাতারাতি এসব দাঈদের মতামত ও কথা উল্টে যেতে দেখল; কথা ও কাজের এই পরস্পরবিরোধিতা তাদের খোদ দ্বীন থেকেই দূরে সরিয়ে দিল।

হ্যাঁ, আমরা জানি অভিমত, ইজতিহাদি রায় বা ফতোয়া পরিবর্তন হতে পারে। এটা গ্রহণযোগ্য, যদি তা বোধগম্য ও যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণে হয়। কিন্তু অযৌক্তিক কারণে রাতারাতি ফতোয়া বা মত বদলে ফেলা কোনোভাবেই মেনে নেয়া সম্ভব না।

ষষ্ঠ গুণ: ভারসাম্য ও মধ্যপন্থা

আদর্শ ব্যক্তিত্বের অন্যতম গুণ হলো, তিনি কোনো ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি করেন না। তিনি কোনো ব্যক্তির অতিরঞ্জিত প্রশংসা করেন না। শাসকদের অতিরিক্ত তোষামোদ করেন না। তাকফিরের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেন না। ইসলামের ঐতিহ্যবাহী রচনাবলীর খণ্ডনে বাড়াবাড়ি করেন না। দাঈদের মাত্রাতিরিক্ত সমালোচনা করেন না। বরং সর্বক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেন। আর মধ্যমপন্থা হলো, অনুসরণীয় আদর্শের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণগুলোর একটি।

সপ্তম গুণ: শারিয়ার প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয়ের বিরোধী না হওয়া

শারিয়ার এমন কিছু স্পষ্ট ও অটল বিষয় আছে, যেগুলো স্থান ও কালভেদে পরিবর্তিত হওয়া অসম্ভব। যেসব বিষয়ে শারঈ দলিলাদি ব্যাপকভাবে সাব্যস্ত এবং আলিম সমাজ সেগুলোর ব্যাপারে সাধারণভাবে একমত। এ ধরনের কোনো বিষয়ের যদি কেউ বিরোধিতা করেন, তিনি অনুসরণযোগ্য হওয়ার উপযুক্ত নন। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ সুন্নাহর প্রামাণিকতাকে অস্বীকার করে অথবা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে অথবা কোনো শাসক, মন্ত্রী বা দলের সন্তুষ্টির জন্য সালাতরত নির্দোষ মুসলিমদের রক্তপাতকে বৈধতা দান করে ইত্যাদি।

আদর্শ ব্যক্তিত্বের অধিকারী কখনোই শারিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিষয়গুলোর বিরোধিতা বা সেগুলোর সীমারেখা লঙ্ঘন করার ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেন না।

অষ্টম গুণ: জ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন প্রকরণের সমাবেশ

বর্তমান যুগে চিন্তা ও ধ্যানধারণার বহু শাখাপ্রশাখা গজিয়েছে এবং জ্ঞানের বিভিন্ন শাস্ত্র একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। বিষয়গুলো সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ, উভয় শ্রেণির মানুষের সাথে সম্পৃক্ত। শারিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিষয়গুলোর বিরোধী, এমন লোকেদের মধ্য থেকেও কিছু ‘আইকন’ সৃষ্টি হয়েছে, যারা বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত ও বক্তব্য পেশ করছে। সুতরাং এই বিশৃঙ্খলা বন্ধ করে, পুনরায় জ্ঞানের ময়দানে সুশৃঙ্খলতা ফিরিয়ে আনতে ও উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সুন্দর সমাধান দেয়ার জন্য, আমাদের এমন সব অনুসরণীয় আদর্শের প্রয়োজন, যারা জ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র ও একাধিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জ্ঞান রাখেন।

অনুসরণের মাপকাঠি ও কিছু সতর্কতা:

প্রথমত: তোমার চোখে যারা প্রভাবশালী বা যেসকল ব্যক্তিত্বের অধিকারীদের তোমার ভালো লাগে, তাদের একটি তালিকা তৈরি করো। এবার উপরে উল্লেখিত গুণগুলোর আলোকে তাদের যাচাই করে দেখো। এর মাধ্যমে এদের মধ্যে কারা অনুসরণযোগ্য এবং তাদের কোন যোগ্যতাগুলোর কারণে তারা তোমার কাছে আদর্শ ব্যক্তিত্বের মহান স্থানে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন সেগুলো বেরিয়ে আসবে।

দ্বিতীয়ত: অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্বের পরিধিটাকে, ইতিহাসের দিক বিবেচনায় একটু বড় করে নাও। শুধুমাত্র জীবিতদের মধ্যে সীমিত করে ফেলো না।

তৃতীয়ত: শুধুমাত্র উদ্দিষ্ট বিষয়গুলোর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করা হবে, বাকি সব ক্ষেত্রে নয়। সুতরাং তুমি যদি এমন কাউকে পাও, যার মধ্যে উপরের গুণগুলো বিদ্যমান; দেখো যে, তার ভালো কাজগুলো কী কী, যেক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করা যাবে। কিন্তু অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কর্মকান্ড বা তিনি যেগুলো উদ্দেশ্য নিয়ে করেননি বা যেসব ব্যাপারে তিনি চুপ আছেন: এসব ক্ষেত্রেও তাকে অনুসরণ করা প্রশ্নবিদ্ধ।

চতুর্থত: অনুসরণ মানে, সে ব্যক্তিত্বের সাথে একেবারে খাপে খাপ মিলে যাওয়া নয়। কারণ এধরনের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের স্থান মানুষের মধ্য থেকে শুধুমাত্র একজনের জন্যই নির্দিষ্ট – রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

পঞ্চমত: অনুসরণের ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করা; যাতে ইমান ও আখলাকের বিভিন্ন দিকও তার অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ অনুসরণকে শুধুমাত্র চিন্তা বা জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না করা।

ষষ্ঠত: অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে উপদেশ ও পরামর্শ নেয়া। তাদের প্রশ্ন করা। শুধুমাত্র তাদের লেকচার শোনা বা বই পড়াকেই যথেষ্ট মনে না করা।

সপ্তমত: অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের গুণাবলীর তারতম্যের উপর ভিত্তিকে করে অনুসরণকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়:

প্রথম স্তর: আংশিকভাবে – শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে।

দ্বিতীয় স্তর: সাধারণভাবে – কর্মপদ্ধতি, চিন্তাভাবনা ও আধ্যাত্মিকতায়।

তৃতীয় স্তর: ব্যক্তিত্বের জীবনের প্রত্যেকটি বিষয়ে সার্বিকভাবে অনুসরণ করা; এটি শুধুমাত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।              

বাস্তব পৃথিবীর দিকে চোখ ফেরাও:

গত শতাব্দীতে ইসলামি উম্মাহর মাঝে বিশিষ্ট কিছু চিন্তাবিদের সমাহার ঘটেছিল, যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ও প্রস্তাবনা পেশ করে গেছেন। সমাজের অনেকগুলো ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু তাদের প্রত্যেকেরই একটি ‘কমন মার্ক’ ছিল: ঐতিহ্যবাহী ইসলামি সাহিত্য [তুরাস বা ক্লাসিক্যাল ইসলামিক লিটারেচার] ও ওহির উপর নির্ভরতার ক্ষেত্রে তাদের দূর্বলতা। এজন্যই তাদের প্রস্তাবনাগুলোর মাঝে এই দুটি জায়গায় ত্রুটি বা কমতি চোখে পড়বে।

এরপর গত শতাব্দীর শেষ ও বর্তমান শতাব্দীর শুরুর দিকে, চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। ইসলামি জ্ঞানের ঐতিহ্যবাহী ধারার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা শুরু হয়। বিশেষত জ্ঞানের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রটিতে তা ছিল চোখে পড়ার মত। কারণটা স্পষ্ট, এই সময়ে উম্মাহ তার প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করে এবং এই ক্ষেত্রটিতে এতদিন তারা অন্য সংস্কৃতিগুলোর চিন্তা ও ধ্যানধারণার অনুগামী ছিল। ফলে ঐ সময়টাতে আমরা দুটো দলের মধ্যে তুমুল বিরোধ ও সংঘাত দেখতে পাই: শারিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধারার আলিম সমাজ বনাম বাস্তব পৃথিবী ও চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দেয়া চিন্তাবিদ সমাজ।

এরপর একেবারে শেষ গত কয়েকটি বছরে, আমরা সম্পূর্ণ নতুন এক অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। শারিয়া জ্ঞানে পারদর্শীরা এখন দৃঢ়তা, ভারসাম্যতা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তব পৃথিবীতে পথ চলতে শুরু করেছে। উম্মাহর এ অংশটি যদি এভাবেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে তাদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং বুদ্ধিমান ও স্বপ্নবাজ তরুণেরা যদি তাদের অনুসরণ করে, ভবিষ্যত প্রজন্মের উপর তার বিশাল প্রভাব পড়বে ইন শা আল্লাহ।


ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত।

অনুবাদ: ইমরান হেলাল

ছবির সূত্র: Eric WardUnsplash

ফুটনোট:

[1] আল-আহযাব: ২১

[2] আলে-ইমরান: ৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *